স্পেনে ইসলামী কারুশিল্পের জাদুঘর

|

স্পেনের কর্ডোভা শহরের সঙ্গে আরব ও মুসলিম সংস্কৃতির যে দৃঢ় বন্ধন রয়েছে, তা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে শহরের একটি জাদুঘর—দশম শতাব্দীর আরব শাসনামলের একটি জনপ্রিয় শিল্পকলার প্রদর্শনী করে। কর্ডোভার সাবেক প্রধান মসজিদ, যা বর্তমানে ‘মস্ক-ক্যাথিড্রাল’ নামে পরিচিত, তা থেকে কয়েক মিনিটের দূরত্বেই অবস্থিত ‘ওমিয়ন গুয়াদামেসি’ জাদুঘর। গুয়াদামেসি ভেড়ার চামড়ার ওপর রঙিন কারুকাজের একটি বিশেষ শিল্পরীতি। মুসলিম স্পেনে যার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছিল। ২০০৬ সালে জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করেন হোসে কার্লস ভিলারেজো গার্সিয়া। ধারণা করা হয়, তিনিই গুয়াদামেসি ইসলামিক আর্টের সর্বশেষ বিশেষজ্ঞ শিল্পী।

হোসে কার্লস একটি শিল্পী পরিবারের সন্তান, যাঁরা কয়েক প্রজন্ম ধরে কারুশিল্পের কাজ করছেন। পার্ক জোয়েরা ডি কর্ডোভার পরিচালক এরিস্টিডস বার্মেজো হার্নান্দেজ—যিনি ওমিয়ন গুয়াদামেসি জাদুঘরের একজন নিয়মিত দর্শক। তিনি বলেন, ‘ইসলামী শিল্পরীতি গুয়াদামেসি আমাদের সংস্কৃতির অন্যতম স্তম্ভ। হোসে কার্লস হারিয়ে যাওয়া ও বিলুপ্ত কিছু নিদর্শন উদ্ধার করেছেন। জাদুঘরটি যেসব জিনিস একত্র করেছে তা ঐতিহাসিক ও শিল্পমূল্যে অগণন। কেননা তিনি উপলব্ধি করেছেন এসব নিদর্শন পুরোপুরি বিলুপ্তির পথে।’ সাংবাদিক জেসাস ক্যাবেরার মূল্যায়নও অনুরূপ। তিনি বলেন, ‘শুধু জাদুঘরটি কর্ডোভা শহরকে অতীতে ডুব দিয়ে প্রাচীন একটি শিল্পরীতি পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেয়।’

হোসে কার্লস ‘পেইন্টেড, অ্যামবুশড লেদারওয়ার্ক’-এ গুয়াদামেসি শিল্পরীতি সংরক্ষণের জন্য হার্নান রুইজ অ্যাওয়ার্ড ২০২০ লাভ করেন। তিনি বলেন, ‘কর্ডোভায় মুসলিম শাসনামলে—যা আমাদের ইসলামী সংস্কৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জমকালো সময়, একই পদ্ধতিতে কাজ করা হতো। ওমিয়ন কর্ডোভার মাদিনাত আল-জাহরায় দশম শতাব্দীতে এই পদ্ধতিই অনুসরণ করা হতো। যদিও পরবর্তী সময়ে স্পেন ও বিশ্বের অন্য অঞ্চলে গুয়াদামেসির শিল্পরীতিতে পরিবর্তন আসে।

আমি ভেড়া বা মেষের চামড়া ব্যবহার করি, যা বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত হয় এবং রুপার পাত দিয়ে যা আচ্ছাদিত করা হয়। চামড়ার ওপর স্বর্ণ-রৌপ্য মিশিয়ে আঁকলেই গুয়াদামেসির পরিপূর্ণ সৌন্দর্য প্রকাশ পায়।’ হোসে রামিরেজ ডেল রিও—একজন স্প্যানিশ বুদ্ধিজীবী ও আরবি ভাষা-সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘মধ্যযুগে কর্ডোভা ছিল আরব ও ইসলামী সংস্কৃতির কেন্দ্র। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে হোসে কার্লসের পুনরুদ্ধার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি আশা করি, তিনি যে অমূল্য টুকরোগুলো তৈরি করছেন তার মূল্য ভবিষ্যতে আরববিশ্বে অনেক বেশি হবে, বর্তমানে স্পেন ও ইউরোপে যতটুকু হচ্ছে।’

শৈশব থেকেই হোসে কার্লস গুয়াদামেসি শিল্পের ভালোবাসায় পড়েন। তিনি বলেন, ‘গুয়াদামেসি শিল্প ও চিত্রের সঙ্গে বেড়ে ওঠার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। খুব অল্প বয়স থেকেই আমাকে তার সৌন্দর্য, কল্পচিত্র ও ধর্মীয় শৃঙ্খলা সম্পর্কে বলা হতো।’ তিনি তাঁর গুরু ও চাচা র‌্যামন গার্সিয়া রোমেরোকে স্মরণ করেন, ‘আমি প্রতিদিন তাঁর সাক্ষাতে যেতাম, তাঁর কৌশলগুলো শিখতাম। একসময় তিনি আমাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেন। এরপর আমার বয়স ও যোগ্যতা বাড়ল। তার দিকনির্দেশনা ছাড়াই কাজ করতে শিখলাম। বাল্যবয়সের খেলার মতোই তা শুরু হয়েছিল। যেন বাতাসে ভাসমান স্বর্ণ-রৌপ্যের কণা নিচে পড়ার আগেই ধরতে হবে।’

হোসে কার্লস মধ্যপ্রাচ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায় আনন্দবোধ করছেন। তিনি বলেন, ‘ফ্রান্স ও মরক্কোতে আমার কাজের প্রদর্শনী হয়েছে এবং অল্প সময়ের মধ্যে দুবাইতে আমার সংগ্রহশালার প্রদর্শনী হবে। মধ্যপ্রাচ্যে আমাকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেন আমি গুয়াদামেসি শিল্প ও তার ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করি।’ হোসে কার্লসের সর্বশেষ প্রদর্শনী হয়েছে ২০১৯ সালে ‘শারজা ইসলামিক আর্ট’ মিউজিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।








Leave a reply