উর্বশী ফুলের সৌন্দর্য: এ যেন মর্তের অপ্সরী

|

উর্বশী, নামটি শুনে হিন্দু পুরাণে উল্লেখিত সুন্দরীশ্রেষ্ঠা, অনন্তযৌবনা কোনো অপ্সরীর কথা মাথায় আসে। তবে পুরাণের স্বর্গের অপ্সরী নয়, আলোচনা করব স্বর্গের অপ্সরীদের মতোই সুন্দর, মোহনীয় ও দুর্লভ একটি উদ্ভিদ প্রজাতিকে নিয়ে। এর বাংলা নাম উর্বশী যার অর্থ সুন্দরীশ্রেষ্ঠা।

ব্রিটিশ ভারতের সাবেক গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম আর্মহাস্টের স্ত্রী ও প্রকৃতি-প্রেমী লেডি সারাহ আর্মহাস্ট, যিনি উনিশ শতকের গোড়ার দিকে এশিয় উদ্ভিদের সংগ্রাহক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার নামানুসারে এই উদ্ভিদটির বৈজ্ঞানিক নামকরণ করা হয় Amherstia nobilis। উদ্ভিদটির অন্যান্য স্থানীয় নামের মধ্যে রাজ অশোক, পারিজাত, কুইন অব দা ফ্লোয়ারিং প্লান্টস, ট্রি অব হ্যাভেন, প্রাইড অব বার্মা, অর্কিড ট্রি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এটি Fabaceae (Pea family) পরিবারের Amherstia গণের একমাত্র সদস্য।

শ্রীলঙ্কা এবং বার্মার বৌদ্ধ মন্দিরে উর্বশী ফুল ব্যবহারের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। উর্বশী আমাদের দেশে প্রচলিত উদ্ভিদ নয়, এটি সাধারণত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের আর্দ্র এবং উর্বর মাটি বিশিষ্ট, রোদ ও আংশিক ছায়াযুক্ত স্থানে জন্মে থাকে। এই উদ্ভিদের আদি নিবাস মিয়ানমারে। তবে বর্তমানে একে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, আমেরিকা ও ইউরোপের কিছু কিছু উদ্যানে শোভা বর্ধনকারী উদ্ভিদ হিসেবে সংরক্ষিত পরিবেশে চাষ করা হয়।

উর্বশীকে উদ্ভিদ জগতের অন্যতম সুন্দর উদ্ভিদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কোনো কোনো প্রকৃতিবিদ একে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের পুষ্প প্রদানকারী উদ্ভিদদের মধ্যে সুন্দরতম বলেও অভিহিত করেছেন। উর্বশী গাছকে দেখতে যেমন সুন্দর তেমনই সুন্দর এর ফুলগুলো। এটি একটি মাঝারি উচ্চতার চিরহরিৎ বৃক্ষ। সাধারণত ১০ থেকে ১৫ মিটার (৩০ থেকে ৫০ ফুট) উচ্চতা বিশিষ্ট হয়ে থাকে। তবে কোন এক অজানা কারণে কখনো কখনো কিছু অঞ্চলে এটি ৫ মিটার (১৫ ফুট) এর বেশি লম্বা হয় না। পাতাগুলো পক্ষল ও যৌগপত্র। ৬ থেকে ৮ সে.মি দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট পাতাগুলো অনেকটা অশোকের পাতার মতো ডাল থেকে ঝুলে থাকে। সেজন্য অনেকেই একে অশোক ভেবে ভুল করে থাকেন। কচি পাতাগুলো দেখতে খুবই সুন্দর, তামাটে রঙের পাতার কোল থেকে বড় বড় পুষ্পমঞ্জরি বের হয়। মঞ্জরিতে সিঁদুররাঙা লাল ফুলগুলো চমৎকার দর্শনীয় ভঙ্গিমায় গাছ থেকে এমনভাবে ঝুলে থাকে যেন দেখে মনে হয় পাখা মেলে বসে আছে লাল রঙের ছোট ছোট কিছু পাখি।

এর ফুল অর্কিডের মতো প্রশাখাময় বলে একে অনেক জায়গায় ‘অর্কিড ট্রি’ নামেও ডাকা হয়। এই ফুলের লাল পাপড়িগুলোর মাঝে সোনালি-হলুদ বর্ণের ফোট উর্বশী ফুলকে করে তুলেছে মোহনীয়, আবার সেই হলুদ ফোটের মাঝে ইংরেজি ‘ভি’ অক্ষরের অবয়বটি যেন তার শ্রেয়ত্বের কথা জানান দিচ্ছে। এই ফুলে ৫টি পাপড়ি রয়েছে যদিও এর মধ্যে ২টি অতি ক্ষুদ্রকায় এবং বাকিগুলো অসম আকারের। এর বৃহৎ পাপড়িগুলো ৭.৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা এবং ৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত চওড়া হতে পারে। সাধারণত ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে এই ফুল ফুটে থাকে।

এরা খুবই কম পরিমাণে ফল দেয়। এর লাল ও সোনালি-হলুদ বর্ণের কচি ফল বা সিডপডগুলো দেখতে অনেকটা শিমের মতো মনে হয় যা কিনা ১১ থেকে ২০ সে.মি পর্যন্ত দীর্ঘ হয়ে থাকে। তবে এর থেকে যাও বা অল্প কিছু ফল পাওয়া যায় সেই তুলনায় ফল থেকে অঙ্কুরোদগম যোগ্য বীজ পাওয়া যায় অতি নগণ্য পরিমাণে। এজন্য এই উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধি করা হয় সাধারণত বায়ু-লেয়ারিং বা সার্কোপোজিং কৌশল ব্যবহার করে। এই প্রজাতির উদ্ভিদগুলো মাটির নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়ার সাথে সিম্বায়োটিক সম্পর্ক গড়ে তোলে, এই ব্যাকটেরিয়াগুলো গাছের শিকড়ে নোডিউল তৈরি করে যা বায়ুমণ্ডল থেকে নাইট্রোজেন সংবন্ধন করে উক্ত গাছের নাইট্রোজেনের চাহিদা পূরণ করে।

প্রাকৃতিক পরিবেশে উর্বশী গাছের দেখা পাওয়াটা খুবই দুর্লভ। বার্মার বনাঞ্চল থেকে বন্য অবস্থায় একে কেবল দুই বার সংগ্রহ করা হয়েছিল। বাংলাদেশের নড়াইলে, মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে এবং পুরান ঢাকার বলধা গার্ডেনে সংরক্ষিত অবস্থায় কিছু উর্বশী গাছের দেখা পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনের তফসিল-৪ অনুযায়ী এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত। অর্থাৎ আইনের ৬ ধারা মোতাবেক এই প্রজাতির উদ্ভিদ ইচ্ছাকৃতভাবে উঠানো, উপড়ানো, ধ্বংস বা সংগ্রহ করা যাবে না। সংরক্ষিত উদ্ভিদ সংক্রান্ত ৬ নং ধারা লঙ্ঘন করলে ৩৯ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি এক বছরের কারাদণ্ড বা পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং পুনরায় একই অপরাধ করলে শাস্তি দ্বিগুণ হবে। এমনকি আইনের ৪১ ধারা মোতাবেক আরো উল্লেখ রয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীনে কোনো অপরাধ সংঘটনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করলে বা উক্ত অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা প্রদান করলে এবং উক্ত সহায়তা বা প্ররোচনার ফলে অপরাধটি সংঘটিত হলে, উক্ত সহায়তাকারী বা প্ররোচনাকারী সংঘটিত অপরাধের জন্য নির্ধারিত দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

এই প্রজাতিটির বিলুপ্তির কথা চিন্তা করে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একে সংরক্ষিত উদ্ভিদ হিসেবে ঘোষণা করাটাও প্রশংসার দাবিদার।








Leave a reply