ব্রডব্যান্ডের কোটি গ্রাহক আটকে আছে ৮৬ লাখে!

|

দেশে ফিক্সড ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গ্রাহক বা ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি। কিন্তু টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা-বিটিআরসির হিসাবে তা আটকে আছে ৮৬ লাখে, তাও আবার দুই মাস ধরে (প্রতিবেদন প্রকাশের তারিখ অনুযায়ী)। দেশে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবি মনে করে, বিটিআরসি প্রতিবেদন প্রকাশের সময় (৩১ জুলাই) ব্রডব্যান্ডের গ্রাহক সংখ্যা উল্লেখ করে ৮৫ লাখ ৭১ হাজার। সে সময়ই প্রকৃতপক্ষে গ্রাহক সংখ্যা ছিল এক কোটি।

আইএসপিএবি সাধারণত একাধিক পদ্ধতিতে গ্রাহক সংখ্যা গণনা করে থাকে, সেই হিসাবে গ্রাহক সংখ্যা কোটি পার হয়ে গেছে এরইমধ্যে। বিটিআরসি হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জুন ও জুলাই এই দুই মাসে ব্রডব্যান্ডের গ্রাহক ছিল ৮৫ লাখ ৭১ হাজার। তার আগের তিন মাসের (মার্চ-মে) হিসাবে একই গ্রাহক সংখ্যা ছিল ৮০ লাখ ৮৪ হাজার। অন্যদিকে জানুয়ারি মাসে গ্রাহক সংখ্যা ছিল ৫৭ লাখ ৪৩ হাজার। ফেব্রুয়ারি মাসের গ্রাহক সংখ্যা ছিল ওই একই। মোবাইল অপারেটরের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা পরিবর্তীতে দেখানো হলেও ব্রডব্যান্ডের গ্রাহক সংখ্যা দুই মাস বা তিন মাস ধরে একই থাকে!

বিটিআরসির প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মার্চ মাসে গ্রাহক সংখ্যা এক লাফে ৫৭ লাখ ৪৩ হাজার থেকে বেড়ে ৮০ লাখ ৮৪ হাজারে উন্নীত হয়। এক মাসে গ্রাহক সংখ্যা বাড়ে ২৩ লাখ ৪১ হাজার। তিন মাস আর কোনও গ্রাহক সংখ্যা বাড়েনি। জুন মাসে এসে গ্রাহক সংখ্যা দেখানো হয় ৮৫ লাখ ৭১ হাজার। জুলাই মাসের প্রতিবেদনে কোনও গ্রাহক বাড়েনি। এখন (৬ অক্টোবর) পর্যন্ত এই সংখ্যাই আছে।

যদিও আইএসপিএবি বলছে ভিন্ন কথা। করোনার কারণে সৃষ্ট লকডাউনের সময় ব্রডব্যান্ডের গ্রাহক বাড়েনি, বরং কমেছে। পরবর্তী সময়ে এসে এই কয়মাসে গ্রাহক সংখ্যা আবার আগের জায়গায় ফিরেছে। যাকে বলা হচ্ছে কোটি গ্রাহক সংখ্যা।

নাম পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে একটি শীর্ষস্থানীয় আইএসপি প্রতিষ্ঠান জানায়, মার্চ মাসে তাদের সংযোগ (লিংক) সংখ্যা ছিল ২০ হাজারের মতো। এর মধ্যে ঢাকায় ৮-৯ হাজার। বাকি সব ঢাকার বাইরের। এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে তাদের ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজারের মতো লিংক চলে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়। মে মাসের দিকে ঢাকার বাইরে তাদের লিংক (ইন্টারনেট সংযোগ) সংখ্যা বাড়তে থাকে। পরে লোকজন ঢাকায় ফিরতে শুরু করলে ঢাকার ব্রডব্যান্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। আগস্ট মাসে আবার আগের জায়গায় ফিরেছে গ্রাহক সংখ্যা।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আইএসপিএবির সভাপতি আমিনুল হাকিম বলেন, ‘আমরা অনেক আগেই বলেছি আমাদের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় এক কোটি। এখন হয়তো আরও বেশি হবে।’ তিনি জানান, মার্চ এপ্রিল মাসে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সংখ্যা বিচ্ছিন্ন হয়েছে প্রায় এক থেকে দেড় লাখের মতো। বিটিআরসি ও আইএসপিএবির হিসাবের ফারাক সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিটিআরসি এখনও জুলাই মাসের হিসাব দেখাচ্ছে। অথচ এখন অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহ শেষ।’

তিনি জানান, তারা বিভিন্ন উপায়ে গ্রাহক হিসাব করে থাকেন। ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের হার বড় একটি উপায়। নেশন ওয়াইড আইএসপি, জোনাল ও ক্যাটাগরি এ, বি, সি’র গ্রাহক হিসাব করে। আইএসপিএবি যে মেকানিজম ব্যবহার করে তার সঙ্গে মোট গ্রাহক সংখ্যার ৫ শতাংশ প্লাস মাইনাস হতে পারে বলে জানান আইএসপিএবির সভাপতি। তিনি আরও জানান, বর্তমানে দেশে এক হাজার ৭০০ থেকে এক হাজার ৭৫০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ ব্যবহার হচ্ছে। এর মধ্যে ৯৫০ থেকে এক হাজার জিবিপিএস ব্যবহার হচ্ছে আইএসপি শিল্পে। অবশিষ্ট ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করছে মোবাইলফোন অপারেটরগুলো। আইএসপি শিল্পের গ্রাহক সংখ্যা গণনায় ব্যান্ডউইথের ব্যবহার বড় ভূমিকা রাখে।

ইন্টারনেট সংযোগ এবং গ্রাহক সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য কীভাবে করা হয় জানতে চাইলে আমিনুল হাকিম বলেন, ‘আমরা প্রতিটি বাসা-বাড়ির সংযোগে গড়ে গ্রাহক বা ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ধরি ৩ জন, আর করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সংযোগে ধরি ২০ জন। এভাবেই আমরা মোট গ্রাহক বা ব্যবহারকারীর হিসাব বের করি।’

ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ এখন ইউনিয়ন পর্যায়ে তথা গ্রামেও পৌঁছে গেছে ফাইবার অপটিক ক্যাবলের মাধ্যমে। কিন্তু সেই তুলনায় গ্রাহক কম। কারণ হিসেবে জানা গেলো ইন্টারনেটের উচ্চ চার্জের কথা। জানা গেছে, গ্রামের লোকজনের মাসিক বাজেট ৩০০-৫০০ টাকা। কিন্তু এনটিটিএন (ভূগর্ভস্থ ক্যাবল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান) ব্যান্ডউইথ পরিবহন (ট্রান্সমিশন) চার্জ বেশি করে রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে আইএসপিগুলোর। ইনফো সরকার-থ্রি প্রকল্পের এই ইন্টারনেট সেবায় এনটিটিএন চার্জ (প্রাইস) আলাদা হওয়া উচিত বলে মনে করে আইএসপিগুলো।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৬৩ জেলার ৪৪৮টি উপজেলার ২ হাজার ৬০০ ইউনিয়নে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পৌঁছানোর জন্য সরকারের আইসিটি বিভাগ বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করে। ইনফো সরকার প্রকল্প-৩ নামের এই প্রকল্পের কাজ এরইমধ্যে ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। তবে কাজ পাওয়া দুই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সামিট কমিউনিকেশন ও ফাইবার অ্যাট হোমকে কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০১৭ সালে। এর আগে উপজেলা পর্যায়ে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার জন্য সরকার হাতে নেয় ইনফো সরকার-টু প্রকল্প।








Leave a reply