প্রশংসাই মাশরাফির মনে এখন কাঁটা হয়ে বিঁধছে

|

১ মে ডাবলিনে পা রাখা বাংলাদেশ আর এখন বার্মিংহামের বাংলাদেশের শরীরী ভাষা যেন এখন ইউরোপিয়ান সামারের যমজ ভাই!

গ্রীষ্ম এসে পড়েছে শুনে মে মাসের শুরুর দিকে ইউরোপে পা রেখে দেখবেন কনকনে শীত। আবার জুনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে তাপমাত্রা। এখন যেমন দিন শুরুই হচ্ছে ২৩-২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস দিয়ে, সঙ্গে হিমেল হাওয়ায় মাতোয়ারা বার্মিংহাম, যা মাশরাফি বিন মর্তুজাদের ডাবলিনের দিনগুলোয় ১১ থেকে তিন ডিগ্রিতে ওঠানামা করেছিল। গত দেড় মাসে বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলের মর্যাদার ব্যারোমিটার তো এমন করেই তিন থেকে ২৪-এ লাফিয়ে উঠেছে!

ব্যাপারটা কাকতালীয় টাই না? বিশ্বকাপ যত গড়াচ্ছে ততই ভালো মাঠে ম্যাচ পাচ্ছে বাংলাদেশ। বার্মিংহামে দেখা যাচ্ছে হোটেলটাও একই ‘সমতা’র। আগের ম্যাচ শহরের লা ভিঞ্চিতে বাংলাদেশ আর প্রতিপক্ষের জন্য সোনারগাঁও মানের হোটেল বরাদ্দ রেখেছে আইসিসি। কিন্তু বার্মিংহামে বাংলাদেশের হোটেলেই উঠেছে ক্ষমতাধর ভারত। না, এর সঙ্গে মাঠের নৈপুণ্যের কিংবা বৈশ্বিক ক্রিকেট রাজনীতির কোনো যোগসাজশ নেই। পুরোটাই পূর্বনির্ধারিত। তবে হোটেলের রেস্টুরেন্ট কিংবা লবিতে ভারতীয় ক্রিকেটারদের উষ্ণতায় কিছুটা অবাকই মাশরাফি। ‘ঋষভ পান্থের সঙ্গে আগে কখনো পরিচয়ই হয়নি। সে-ও আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরেছিল’, ইন্দো-বাংলা ক্রিকেটীয় সোশ্যাল মিডিয়ার অকারণ বৈরিতার প্রসঙ্গে বলছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। বিরাট কোহলি মাঠে যতটা যুদ্ধংদেহি, বাইরে ততটাই বন্ধুবৎসল। আর মহেন্দ্র সিং ধোনির অভিষেক তো মাশরাফির চোখের সামনে, ২০০৪ সালে ঢাকায়। দুই দিন আগে লবিতে দুজনের ছবিটা ভাইরাল হয়ে গেছে।

কী নিয়ে আলাপ করছিলেন দুজন? ‘বলছিলাম, আমাদের দুজনকে একসঙ্গেই তো যেতে হবে’, ট্রেডমার্ক কৌতুক মাশরাফির। ক্যারিয়ারের শেষ আট বছর ধরেই তো অবসরচর্চা করতে হচ্ছে তাঁকে। ২০১১ বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে বাদ পড়ার হতাশায় না অবসরই নিয়ে ফেলেন ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’, আশঙ্কা জেগেছিল। তারও আগে সর্বনাশা ইনজুরি এবং পরে অন্তত ডজনখানেকবার অবসর ভাবনার মুখোমুখি হতে হয়েছে মাশরাফিকে। তাই অবসর নিয়ে তাঁর সর্বশেষ চিন্তা, ‘একদিন হুট করে বলে দেব।’ কবে, সেটা বিশ্বকাপের দুইটা মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে বলতে রাজি নন মাশরাফি।

বরং ধোনি থেকে শুরু করে কোহলি, অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চ এবং যাঁর সঙ্গে দেখা হচ্ছে তাঁর মুখে বাংলাদেশের প্রশংসার কথা শুনলে নীরবে মনঃকষ্ট আড়াল করাতেই ব্যস্ত মাশরাফি, ‘দেখা হলে সবাই একটা কথা দিয়েই শুরু করছে যে ‘তোমরা খুব ভালো খেলেছ। এখনো সেমির লড়াইয়ে আছ।’ শুনে কী যে কষ্ট হয়! বলতে পারি না যে ‘আরে ‘আমাদের তো এখন সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে ফুরফুরে মেজাজে ঘুরে বেড়ানোর কথা!’ সেসব বলেন না যদি আবার প্রশংসাকারী অত্যুক্তি বলে মনে করেন, এই সংকোচে।

সত্যি তাই। শ্রীলঙ্কা ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া নিয়ে আর কোনো অনুযোগ নেই তাঁর। প্রকৃতি তো আর নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু নিউজিল্যান্ড ম্যাচটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মনের ক্ষত বাড়াচ্ছে মাশরাফির, ‘ওই একটা নিশ্চিত জেতা ম্যাচ আমরা হেরেছি।’ বাজে ফিল্ডিং হয়েছে, সেটা আবার ঢাকাও পড়ে গেছে মুশফিকুর রহিম রান আউট হওয়ার পরেরভাগের ব্যাটিংয়ে। শেষ ওভারে মুস্তাফিজুর রহমান উইকেট সোজা বল করলেও জিতে যেতে পারত বাংলাদেশ। অধিনায়কের আক্ষেপ, ‘ইস, যদি ওই দিন অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের ইনিংসটা খেলত রিয়াদ (মাহমুদ উল্লাহ)!’ সেদিন নিউজিল্যান্ড হেরে গেলে এখন ইংল্যান্ডের ভরাডুবির প্রাণান্ত প্রার্থনা করতে হতো না বাংলাদেশকে। অবাক লাগে শুনে যে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের স্ক্রিপ্ট নিয়ে মনে আফসোসের মেঘ আছে মাশরাফির, ‘এগুলো এখন বললে বাড়াবাড়ি শোনাতে পারে। তবে ওই দুইটা ম্যাচও অন্য রকম হতে পারত। নিজেদের কিছু সিদ্ধান্তহীনতার কারণে হেরেছি।’

আশ্চর্য লাগছিল শুনে। ত্রিদেশীয় সিরিজ চলাকালে ডাবিলনে বাংলাদেশ দলের বলয়ে সেমিফাইনালের ভাবনা মাঝেমধ্যে উঁকি দিলেও আশঙ্কার মেঘই ওড়াউড়ি করছিল বেশি। সেসবের পেছনে অবশ্য ক্রিকেটীয় ব্যাখ্যার চেয়ে উগ্র ক্রিকেট সমর্থকদের ভয়টাই ছিল বেশি। যদি এদিক-সেদিক হয়, তাহলে তীব্র সমালোচনার সর্বনাশা সুনামিতে ভেসে যেতে হবে পুরো দলকে।

তাই প্রকাশ্যে বিশ্বকাপ ভাবনার কথা প্রবল সতর্কতার সঙ্গেই বলছিলেন মাশরাফি। প্রতিটা ম্যাচ ধরে ধরে এগুনোর পরিকল্পনার কথাই শুধু বলতেন তিনি। বরং দলের কোনো কোনো সদস্যের ওপর ক্ষুব্ধই ছিলেন অধিনায়ক। তাঁরা যে ঢোল পিটিয়ে সেমির স্বপ্নের কথা জানিয়েছিলেন! সেই মাশরাফি ২৮ জুন বার্মিংহামের হায়াত রিজেন্সির সামনে দাঁড়িয়ে বলছেন, ‘বিশ্বকাপে

আমাদের এই দলটা সেরা। দুঃখ লাগবে যদি এই দল নিয়েও সেমিতে খেলতে না পারি। আপনি জনে জনে জিজ্ঞাসা করে দেখেন, প্রত্যেকেই সেমিতে ওঠার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিল।’

একটা স্বপ্নপূরণ নতুন স্বপ্নের জন্ম দেয়। যদি ইংল্যান্ড পরের দুইটা ম্যাচ হেরে যায় আর বাংলাদেশ ভারত কিংবা পাকিস্তান ম্যাচের একটা জেতে, তাহলেই সেমি নিশ্চিত। আর সেমিফাইনালে উঠে যাওয়ার দৃশ্য কল্পনায় এঁকে মাশরাফি রাখঢাকহীন, ‘এই বাংলাদেশ তখন অন্য লেভেলের দল হয়ে উঠবে! মাত্র দুইটা তো ম্যাচ।’

আসলেই, মাত্রই দুইটা ম্যাচ! তার আগে ভারত ও পাকিস্তান ম্যাচ তৈরি ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপকে উপমহাদেশীয় রোমাঞ্চে রাঙানোর জন্য।








Leave a reply