রোজ সকালে তিনটি সেদ্ধ ডিম ও কফি খেলে কি সত্যিই মেদ কমে? পুষ্টিবিদদের চাঞ্চল্যকর তথ্য
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়া সকালের নাশতায় তিনটি সেদ্ধ ডিম ও কফি খাওয়ার ডায়েট সাময়িকভাবে ওজন কমাতে সাহায্য করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা শরীরে পুষ্টির ঘাটতি ও হজমের গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসকেরা।
আজকাল দ্রুত ওজন কমাতে বা পেটের মেদ ঝরাতে অনেকেই হুজুগে মেতে বিচিত্র সব ডায়েট অনুসরণ করছেন। এরই ধারাবাহিকতায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইদানীং একটি বিশেষ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে সকালের নাশতায় কেবল তিনটি সেদ্ধ ডিম এবং এক কাপ ব্ল্যাক কফি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এই খাদ্যতালিকাকে স্বাস্থ্যকর মনে হলেও চিকিৎসকেরা এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীরা দীর্ঘমেয়াদে এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এক মাস টানা এই রুটিন মেনে চললে শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, তা নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
পুষ্টিগুণের ভারসাম্য ও সাময়িক ওজন হ্রাস দিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালের পুষ্টিবিদ রিচা শর্মা জানান, সেদ্ধ ডিম অত্যন্ত পুষ্টিকর একটি খাদ্য। এতে উচ্চমাত্রার প্রোটিন, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি, অ্যামিনো অ্যাসিড ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট রয়েছে। অন্যদিকে চিনি ও দুধ ছাড়া ব্ল্যাক কফিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট, যা মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া বাড়াতে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কেউ নিয়মিত সুষম খাবার খাওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত শারীরিক কসরত করেন এবং এক সপ্তাহ সকালের নাশতায় এই ডিম ও কফির সংমিশ্রণ রাখেন, তবে তাঁর ওজন কিছুটা কমতে পারে। তবে এটি কখনই দীর্ঘমেয়াদী বা আদর্শ প্রাতরাশ হতে পারে না।
ফাইবার ও খনিজের মারাত্মক ঘাটতি ডিম ও কফির এই জুটিতে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন মিললেও এতে কোনো ফাইবার বা আঁশ থাকে না। টানা এক মাস সকালে এই খাবার খেলে শরীরে ফাইবার, প্রয়োজনীয় ভিটামিন এবং খনিজের মারাত্মক অভাব দেখা দিতে পারে। সকালের নাশতায় পুষ্টির যে ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন, তা কেবল ডিম ও কফি দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। এর সাথে ফলমূল বা সালাদ যুক্ত না করলে শরীর পুষ্টিহীনতায় ভুগতে পারে।
হজমের গোলযোগ ও পেটের সমস্যা মুম্বইয়ের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট বা পেটের রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শঙ্কর জাঁওয়ার এই বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর মতে, দিনের পর দিন খাবারে ফাইবারের ঘাটতি থাকলে অন্ত্রের বা গাটের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। প্রোটিন হজম করা শরীরের জন্য কিছুটা জটিল। তাই প্রতিদিন সকালে তিনটি করে ডিম খেলে অনেকেরই গ্যাস, বুক জ্বালাপোড়া ও বদহজমের সমস্যা হতে পারে। এর পাশাপাশি কফি অন্ত্রে এক ধরনের প্রদাহ তৈরি করতে পারে, যা যাদের গ্যাস্ট্রিক বা অম্বলের সমস্যা রয়েছে তাদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ফাইবারের অভাব দীর্ঘস্থায়ী হলে কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যাও দেখা দেয়।
বিকল্প ও স্বাস্থ্যকর প্রাতরাশ বিশেষজ্ঞরা মেদ কমানোর জন্য এমন একঘেয়ে ও পুষ্টিহীন ক্রাশ ডায়েটের পরিবর্তে টেকসই ও সুষম খাদ্য তালিকা তৈরির পরামর্শ দিচ্ছেন। ডিম ও কফি খাওয়ার ইচ্ছে থাকলে তার পাশাপাশি ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার রাখা জরুরি। চিকিৎসকদের মতে, সুস্থ উপায়ে ওজন কমাতে সকালের নাশতায় ওটস চিলা, বেসন চিলা, সুজির উপমা কিংবা পুষ্টিকর স্মুদি যোগ করা যেতে পারে। প্রত্যেকের শরীরের ধরণ ও প্রয়োজন আলাদা, তাই যেকোনো ডায়েট শুরু করার আগে একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।