হাজার কোটি টাকার ব্যবসা ‘ইভ্যালি’র গ্রাহক ঠকিয়ে

|

একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন আমিনুর রহমান রাসেল। আলোচিত মার্কেটপ্লেস ইভ্যালিতে শতভাগ ক্যাশব্যাকের অফার দেখে এক লাখ টাকায় একটি মোটরসাইকেলের ক্রয়াদেশ দেন তিনি। তিন মাসের মধ্যে তাকে মোটরসাইকেল দেয়ার কথা থাকলেও ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে চার মাস। আদৌ সেই মোটরসাইকেল পাবেন কিনা, না পেলে টাকা ফেরত পাবেন তো- এ নিয়ে মহাচিন্তায় আছেন তিনি।

করোনার মহামারির প্রকোপে মানুষ গৃহবন্দি হয়ে পড়ায় গত মার্চ থেকেই অনলাইন শপের চাহিদা বেড়ে যায়। আর এই সুযোগে এক শ্রেণির প্রতারক মেতেছে প্রতারণায়। ক্রয়াদেশ অনুযায়ী সঠিক পণ্য সরবরাহ না করা, বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব, সরবরাহে দেরি করাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে। তেমনই একটি অনলাইন মার্কেট প্লেস ইভ্যালি। এ অনলাইন বাজার থেকে পণ্য কিনে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন রাসেলের মতো অসংখ্য গ্রাহক। প্রতিদিনই ফেসবুকে ভোগান্তির অভিযোগ তুলে ধরছেন গ্রাহকরা। ভুক্তভোগী অনেকেই অভিযোগ করেছেন, ইভ্যালি অধিকাংশ পণ্য বিক্রিতে বড় ধরনের ছাড় অফার করে থাকে। কিন্তু পণ্যের ক্রয়াদেশ দেয়ার পর মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও তা সরবরাহ পাওয়া যায় না। ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে দুই বছর পার না হতেই প্রতিষ্ঠানটি এক হাজার কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করেছে। অথচ গত মার্চ পর্যন্ত কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ছিল মাত্র ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া ইভ্যালি যে ওয়ালেট পদ্ধতিতে টাকা রাখছে, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সবিহীন। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ায় মানিলন্ডারিংয়ের সুযোগ রয়েছে।

এদিকে ‘ইভ্যালি’র বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ ওঠায় গত বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটি ও এর চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ রাসেলের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। মানিলন্ডারিং বা আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখছে বিএফআইইউ।

এ বিষয়ে গত শুক্রবার ফেসবুক লাইভে এসে ইভ্যালির প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ রাসেল বলেন, যতদিন পর্যন্ত ব্যাংক হিসেব সচল না হয় ততদিন ক্যাশ অন ডেলিভারির (পণ্য পেয়ে মূল্য পরিশোধ) মাধ্যমে পণ্য বিক্রি হবে। কীভাবে ইভ্যালি ৮০-১৫০ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাশব্যাক দেয় তার জবাব দিতে গিয়ে রাসেল বলেন, আমরা লস দেয়ার জন্য ব্যবসা করছি না। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যদি বাজারের কোনো ১০০ টাকার পণ্য আমি ৩০ টাকায় কিনতে পারি এবং সেটা আমি ১০০ টাকায় বিক্রি করি; তারপরও আমি আমার লাভের অংশ থেকে ক্যাশব্যাক অফার দিতে পারি। এমন কিছু ব্যবসায়িক বিষয় আমরা অবলম্বন করি- যা সচারচার যেসব ব্যবসায়িক পদ্ধতি মার্কেটে চলমান তার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। কিন্তু তার মানে এই না যে, আমরা খারাপ কিছু করছি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইভ্যালির নিবন্ধিত গ্রাহক ৩৫ লাখ ছাড়িয়েছে। মাসে লেনদেন হচ্ছে তিনশ কোটি টাকার পণ্য। ১ হাজার ৫শ কোটি টাকার পণ্য বিক্রির বিপরীতে কর দেয়া হয়েছে মাত্র দেড় কোটি টাকা। গড়ে প্রতি মাসে পণ্য বিক্রির অর্ডার পাচ্ছে তারা ১০ লাখ করে। তাদের সঙ্গে এরই মধ্যে যুক্ত হয়ে পড়েছে ২৫ হাজার বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান এবং তারা ৪ হাজার ধরনের পণ্য বিক্রি করে কমিশন পাচ্ছে।

২০১৮ সালের ১৪ মে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর নিবন্ধকের কার্যালয় (আরজেএসসি) থেকে নিবন্ধন নেয় ইভ্যালি ডটকম লিমিটেড। শুরুতে এর অনুমোদিত মূলধন ছিল ৫ লাখ টাকা। আর পরিশোধিত মূলধন ছিল মাত্র ৫০ হাজার টাকা। অবশ্য গত মার্চে কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন বাড়িয়ে ১০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন এক কোটি টাকা করা হয়েছে।

জানা যায়, অগ্রিম মূল্য পরিশোধ করেই প্রতারণার ফাঁদে পড়ছে অধিকাংশ মানুষ। এছাড়া পণ্য ডেলিভারির সময়ও প্রতারকের পাতা ফাঁদে পড়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ক্রেতারা। আবার অবিশ্বাস্য রকম মূল্য হ্রাসের ঘোষণা দিয়ে ‘আর মাত্র ৩টি ফোন সেট বাকি আছে’ এরকম বিজ্ঞাপন ব্যবহার করে প্রলুব্ধ করা হয় ক্রেতাদের। মূলত, দেশে অনলাইনে কেনাকাটার পরিমাণ বছরে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা না থাকায় লেনদেনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং মান নিয়ন্ত্রণে নজরদারির অভাবে থেকে যাচ্ছে। জানতে চাইলে কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, অনলাইন মার্কেটিংয়ে আমাদের নিজেদেরও সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। এছাড়া কেনাকাটা করার ক্ষেত্রে অগ্রিম টাকা না দেয়াই ভালো। এতে প্রতারণার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তিনি বলেন, অনলাইন ব্যবসার পরিধি বাড়ানো উচিত। তবে এসোসিয়েশেনের উচিত, অনলাইন ব্যবসা কীভাবে পরিচালিত হবে সে বিষয়ে নির্ধারিত গাইডলাইন তৈরি করা। পাশাপাশি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া।

ইভ্যালির নিয়ে অভিযোগ উঠেছে, যাদের পণ্য ডেলিভারি দেয়া হয় না প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি তাদের টাকাও ফেরত দেয় না। ইভ্যালির ওয়েবসাইটে গ্রাহকের করা অ্যাকাউন্টে এ টাকা রেখে পরে পণ্য কিনলে অ্যাডজাস্ট করা হবে বলে জানানো হয়। যা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে একটি অপরাধ। আইনের ৪৫ ধারায় উল্লেখ আছে, প্রদত্ত মূল্যের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রয় বা সরবরাহ না করা হলে অনূর্ধ্ব এক বছর সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। সিরাজুল ইসলাম নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, ইভ্যালিতে যে পণ্যটির অর্ডার দিয়েছি সেটা না পাওয়ায় আমি ভোক্তা অধিকারে লিখিত অভিযোগ করি। কিন্তু সেখানে ইভ্যালির কয়েকজন কর্মকর্তা ভোক্তা অধিকারের পরিচালকের রুমে ক্ষমা চেয়ে আমার পণ্য ফিরিয়ে দেয়ার প্রতিজ্ঞা করেন। তিনি বলেন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে প্রতিদিনই আমার মতো এমন ভুক্তভোগী অভিযোগ করছেন।

পণ্য কিনতে গিয়ে প্রতারিত হওয়ায় গত ১৪ জুলাই দুদক চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করেন ঢাকার মিরপুর ডিওএইচএসের বাসিন্দা আমানউল্লাহ চৌধুরী। চিঠিতে ইভ্যালি নিয়ে তদন্ত করার অনুরোধ জানান তিনি। আমানউল্লাহ চৌধুরী জানান, ইভ্যালির কার্যক্রম অনেকটা এমএলএম কোম্পানির মতো। এমএলএম কোম্পানিগুলোর প্রতারণার মতোই ইভ্যালিও করছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এখানে মানিলন্ডারিং হচ্ছে। তাই দেশের ই-কমার্স প্লাটফরমকে বাঁচাতে এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে ‘ইভ্যালি’র বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ ওঠায় প্রতিষ্ঠানটি এবং এর চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ রাসেলের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) গত ২৭ আগস্ট দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের কাছে চিঠি দিয়ে দুজনের ব্যাংক হিসাব ৩০ দিনের জন্য স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএফআইইউর প্রধান বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান গতকাল সোমবার ভোরের কাগজকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি এবং এর এমডি ও চেয়ারম্যানের ব্যাংক হিসাব খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এটা বিএফআইইউর নিয়মিত কাজের একটা অংশ। যে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেই প্রতিষ্ঠান এবং তার প্রধানদের ব্যাংক হিসাব খতিয়ে দেখা হয়। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তথ্য দেয়ার জন্য। নির্ধারিত সময়ে তথ্যগুলো হাতে পেলে আমাদের আইন অনুযায়ী, তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে যদি আইনের কোনো ভায়োলেশন কিংবা মানিলন্ডারিংয়ের কোনো ইলিমেন্ট পেলে আমরা ‘ল’ এন্ড এনফোর্সমেন্টে’ পাঠিয়ে দেই। তারা আরো তদন্ত করবে।








Leave a reply