শেখ হাসিনার দয়ায় নুর বানুরা এখন ২০ লাখ টাকা দামের ফ্ল্যাটের মালিক

|

৩০ বছর ধরে এলাকার এবাড়ি-ওবাড়ি ও আশপাশের শুঁটকি কারখানায় ভিক্ষা করে সংসার চালিয়েছেন নুর বানু। থাকতেন শুঁটকিমহালের পাশের গ্রাম ফদনারডেইলে। বৃষ্টি হলেই নুর বানুর বাঁশের বেড়া ও পলিথিনের ছাউনিযুক্ত ছোট্ট ঝুপড়িঘরটি ডুবে যেত। তখন চার মেয়েকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করতে হতো তাঁর । এক মাসের বেশি সময় ধরে নুর বানুর ভ্যাগের বদল ঘটেছে । স্থানীয় লোকজন জানালেন, তিনি এখন ভিন জগতের মানুষ। তাঁর কপাল খুলে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দয়ায় নুর বানু এখন ২০ লাখ টাকা দামের ফ্ল্যাটবাড়ির মালিক।

স্থানীয় লোকজন যে ‘ভিন জগৎ’-এর কথা জানালেন, সেটি খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকা। এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ অগ্রাধিকার প্রকল্প। কক্সবাজার সদরের খুরুশকুলে বাঁকখালী নদীর তীরে এ প্রকল্পের আওতায় তৈরি হচ্ছে ১৩৭টি পাঁচতলা ভবন। যেখানে ঠাঁই হবে ৪ হাজার ৪০৯ পরিবারের অন্তত ২০ হাজার জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষের। গত ২৩ জুলাই গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রথম ধাপে তৈরি ২০টি ভবনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় অন্তত ৬০০ জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারের হাতে ফ্ল্যাটবাড়ির চাবি হস্তান্তর করা হয়। চাবিতে লেখা আছে, ‘আশ্রয়ণের অধিকার, শেখ হাসিনার উপহার’।

খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রামু ১০ পদাতিক ডিভিশন। এখানে নির্মাণাধীন ১৩৭টি পাঁচতলা ভবনের প্রতিটিতে ৬৫০ বর্গফুট আয়তনের ৩২টি করে ইউনিট (ফ্ল্যাট) থাকছে। সেখানে আশ্রয় নেবে ৩২টি করে পরিবার।

জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ২০ লাখ টাকা দামের প্রতিটি ফ্ল্যাটবাড়ির মালিক হতে একেকটি পরিবারের খরচ হবে মাত্র ১ হাজার ১ টাকা। ফ্ল্যাটের মালিকানার দলিল যেদিন হস্তান্তর হবে, সেদিন ১ হাজার ১ টাকা আদায় করা হবে। দলিল তৈরির কাজ চলছে। এত অল্প টাকায় ফ্ল্যাটবাড়ির মালিক হওয়ার নজির বিশ্বের কোথাও নেই। এটি প্রধানমন্ত্রীর দয়া ও আন্তরিকতার বলেই সম্ভব হয়েছে।

নুর বানুর মতো উপকূলের জেলে, শুঁটকিশ্রমিক, রিকশা, ভ্যানচালকসহ অনেকে এখন এ প্রকল্পের কল্যাণে ফ্ল্যাটের মালিক।

আশ্রয়ন প্রকল্পের প্রতিটি ভবনের নিচতলায় রয়েছে কেনাকাটার দোকানপাট। দূরে তৈরি হয়েছে বড় একটি দিঘি, তার পাশে স্কুল ও পণ্য বেচাকেনার মার্কেট।

প্রতিটি ভবনের নিচতলায় রয়েছে কেনাকাটার দোকানপাট। দূরে তৈরি হয়েছে বড় একটি দিঘি, তার পাশে স্কুল ও পণ্য বেচাকেনার মার্কেট। তবে এখনো সেগুলো চালু হয়নি।

ভবনের পাশে একটি দোকানের সামনে পাওয়া গেল সেই নুর বানুকে। তাঁর হাতে লাঠি। লাঠির ওপর ভর দিয়ে তিনি হাঁটাচলা করেন তিনি। নুর বানু বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আমরা অনেকে কৃতজ্ঞ। তিনি আমাদের উপকূলের ঝুপড়িঘর থেকে তুলে এনে ফ্ল্যাটবাড়ির মালিক বানিয়েছেন। এ জন্য প্রতিদিন নামাজে তাঁর (প্রধানমন্ত্রীর) জন্য দোয়া করি, তাঁর সুস্থ ও দীর্ঘায়ু জীবন কামনা করি। এখন ফ্ল্যাটবাড়িতে আমরা আরামে ঘুমাতে পারছি।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের উত্তর পাশে পাঁচতলা ভবন ‘শনখালী’। এই ভবনের চারতলায় ৪০৭ নম্বর ফ্ল্যাটটি নুর বানুর। সঙ্গে থাকে দুই কিশোরী মেয়ে আয়েশা (১৫) ও রাশেদা (১২)।

কোরাল ভবনের দ্বিতীয় তলার ২০৭ নম্বর ফ্ল্যাটে থাকেন রুনা আক্তার (২৫)। স্বামী আবুল কাশেম মাছ ধরতে ট্রলার নিয়ে সাগরে গেছেন। ঘরে দুই ছেলে, এক মেয়ে। রুনা আক্তার বলেন, ‘বিনা মূল্যে ফ্ল্যাটবাড়ির মালিক হব, কল্পনাও করিনি। শেখ হাসিনা এককথার মানুষ। যেমন ওয়াদা, তেমন কাজ। আমরা তাঁর কাজে কৃতজ্ঞ।’

জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় আনা পরিবারগুলোর আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রকল্প এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবার জন্য হাসপাতাল, ক্লিনিক, বিনোদনের পার্ক ইত্যাদি। উপকারভোগীদের অধিকাংশের পেশা ট্রলার নিয়ে বঙ্গোপসাগরে মাছ আহরণ এবং উপকূলে বিভিন্ন মহালে কাঁচা মাছকে রোদে শুকিয়ে শুঁটকি উৎপাদন। প্রকল্পে আশ্রয় পাওয়া এসব মৎস্যজীবীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং শুঁটকি উৎপাদনের জন্য প্রকল্প এলাকায় তৈরি হবে আধুনিক শুঁটকিপল্লি।

কক্সবাজার শহর থেকে সাত কিলোমিটার উত্তরে খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্পে যাতায়াতের জন্য বাঁকখালী নদীর ওপর তৈরি হচ্ছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৯৫ মিটার দীর্ঘ সেতু ও সংযোগ সড়ক। আশ্রয় গ্রহণকারীদের জীবনমান উন্নয়নে সমবায় সমিতি গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে সদস্যদের হাঁস-মুরগি, পোলট্রি, সেলাইসহ নানা কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ফ্ল্যাট পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কমিটির মাধ্যমে উপকারভোগীদের জীবন–জীবিকা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য-শিক্ষা, ভবন ও রাস্তাসমূহের রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে বলে জানান জেলা প্রশাসক।

উল্লেখ্য,২০১৮ সালে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের করতে সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়। রানওয়েসহ অন্যান্য অবকাঠামো তৈরির জন্য অধিগ্রহণ করতে হয়েছে বিমানবন্দরের পশ্চিম পাশ লাগোয়া কুতুবদিয়াপাড়া, ফদনারডেইল, নাজিরারটেক উপকূলের বিপুল পরিমাণ সরকারি খাসজমি। সেখানে এক যুগের বেশি সময় ধরে বসবাস করছিল চার হাজারের বেশি জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবার। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে জেলার কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া, পেকুয়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ঘরবাড়ি হারিয়ে বিমানবন্দরের পাশে সমুদ্র উপকূলে আশ্রয় নিয়েছিলেন এসব গৃহহীন মানুষ। প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজারে এসে জনসভায় ঘোষণা দিয়েছিলেন, মাথা গোঁজার বিকল্প ঠাঁই না করে সরকারি খাসজমি থেকে কাউকে উচ্ছেদ করা হবে না।

এরপর অধিগ্রহণ করা সরকারি খাসজমিতে বসবাসকারী ৪ হাজার ৪০৯ পরিবারের অন্তত ২০ হাজার জলবায়ু উদ্বাস্তুকে পুনর্বাসনের জন্য খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের জন্য খুরুশকুলে অধিগ্রহণ করা হয় ২৫৩ দশমিক ৩৫০ একর জমি। এ প্রকল্পে ১৩৭টি পাঁচতলা ভবন ছাড়াও ১০ তলার আরেকটি দৃষ্টিনন্দন ভবন হচ্ছে। ভবনটির নামকরণ হয়েছে ‘শেখ হাসিনা টাওয়ার’। প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। এ পর্যন্ত পাঁচতলাবিশিষ্ট ১৯টি ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। আরও একটি ভবনের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে। এখন এসব ভবনে ফ্ল্যাট বরাদ্দ পেয়েছে ৬০০টি পরিবার। পরিবারগুলো অধিকাংশ শুঁটকিশ্রমিক, জেলে, ভ্রাম্যমাণ শুঁটকি বিক্রেতা, রিকশা ও ভ্যানচালক, যাঁদের দিন এনে দিন খেতে হয়। কয়েকটি পরিবার আছে ভিক্ষা করে চলে।

প্রকল্পের একটি বিশেষ ব্যাপার হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন ২০টি ভবনের নান্দনিক নামও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই। নামগুলো হচ্ছে দোলনচাঁপা, কেওড়া, রজনীগন্ধা, গন্ধরাজ, হাসনাহেনা, কামিনী, গুলমোহর, গোলাপ, সোনালি, নীলাম্বরী, ঝিনুক, কোরাল, মুক্তা, প্রবাল, সোপান, মনখালী, শনখালী, বাঁকখালী, ইনানী এবং সাম্পান।








Leave a reply