রবিউল জানাল হামলার আদ্যোপান্ত

|

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলায় অভিযুক্ত রবিউল ইসলামের একটি গোপন সিমকার্ড ছিল। ঘটনার পর ধরা পড়ার আশঙ্কায় সেই সিমকার্ড ধ্বংস করে ফেলেছিলেন তিনি। ইউএনওর বাসা থেকে অর্ধলক্ষাধিক টাকা চুরিও করেন রবিউল। সেই টাকার একটি অংশ জনৈক খোকনের কাছে রাখেন। এরই মধ্যে খোকনকে আটক করে সাক্ষী হিসেবে তার বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। তবে চুরি করা তার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল না। আগের ক্ষোভ থেকে ইউএনওর ওপর নৃশংস হামলার ছক ছিল রবিউলের। তিনি সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নও করেন। ঘটনার আকস্মিকতায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে বাধা পেয়ে ইউএনওকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেননি রবিউল, পূর্বপরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিনি বর্বরোচিত হামলা করেছিলেন। গতকাল সোমবার তদন্ত সংশ্নিষ্ট একটি দায়িত্বশীল সূত্র সমকালকে এসব তথ্য জানায়।

রবিউলকে ছয় দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে স্থানীয় পুলিশ। ইউএনওর বাসায় প্রবেশ, তার ওপর হামলা থেকে শুরু করে ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা করেন তিনি। রবিউল স্বীকার করেন, তিনি একাই এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। হামলার সময় যে শার্ট, প্যান্ট ও মাস্ক পরিহিত ছিলেন তা পুড়িয়ে ফেলেছিলেন রবিউল। তার সঙ্গে থাকা ব্যাগে আরেক সেট পোশাক পরিধান করে স্বাভাবিক বেশে ঘটনা ঘটানোর পর বেরিয়ে যান তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ঘটনার রাতে রবিউলের অবস্থান জানতে প্রযুক্তিগত তদন্তকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি তার স্বজনদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে রবিউলের মা পুলিশের কাছে দাবি করেন, ঘটনার রাতে রবিউল বাসায় ছিলেন। তবে প্রযুক্তিগত তদন্তে পুলিশ দেখেন, ঘটনা ঘটানোর পর আবার বাসায় ফেরত যান তিনি।

তদন্ত সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, অর্থকষ্ট আর চাকরি থেকে সাসপেন্ড হওয়ায় মানসিকভাবে অশান্তিতে ছিলেন রবিউল। পরিকল্পনা করেই নিজ বাড়ি দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলার বিজোড়া গ্রাম থেকে বিকেল ৪টার দিকে ঘোড়াঘাটে যাওয়ার উদ্দেশে রওনা হন রবিউল। দিনাজপুর ফুলবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি যাত্রীবাহী গাড়িতে রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঘোড়াঘাটে পৌঁছেন তিনি। এরপর ঘোড়াঘাট বাজারের বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করে রাত ১টার দিকে ইউএনওর বাসভবনের প্রাচীর টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন রবিউল। ওই সময় ইউএনও বাসভবনের চারদিকে নীরবতা ছিল।

জিজ্ঞাসাবাদে রবিউল আরও দাবি করেন, প্রথমে নৈশপ্রহরী নাদিম হোসেন পলাশের কক্ষে যান তিনি। তখন পলাশ নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিলেন। তার কক্ষে ইউএনওর বাসভবনের কেচিগেট ও প্রধান ফটকের তালার চাবি খুঁজতে থাকেন। চাবি না পাওয়ায় পলাশের কক্ষ থেকে বের হয়ে পরিত্যক্ত কাঠ রাখার ঘরের কাছে গিয়ে একটি চেয়ার ও মই নিয়ে ইউএনওর বেডরুমে নৃশংস কায়দায় হামলার পরিকল্পনা করেন। রবিউল ওখানে মালি পদে চাকরি করার সময় মই দিয়েই ইউএনওর সরকারি বাসভবনে কবুতরের বাসা পরিস্কার করতেন।

পরিকল্পনা মোতাবেক ভেন্টিলেটর দিয়ে ঘরে প্রবেশ করার জন্য মই সেট করেন রবিউল। তবে মই দিয়ে ওয়াল বেয়ে ভেন্টিলেটর খুলে ভেতরে প্রবেশ করে তিনি দেখেন- যেখানে প্রবেশ করেছেন সেটি বেডরুম নয়, বাথরুম। আর সেই বাথরুমের দরজা ভেতর থেকে লাগানো। তাই ওই সময় ইউএনওর ঘুমের কক্ষে প্রবেশ করতে পারেননি তিনি। তখন রবিউল অপেক্ষা করতে থাকেন, কখন ইউএনও বাথরুমে প্রবেশ করবেন সেই ক্ষণের। এরই মধ্যে রবিউল বাথরুমের ভেতর থেকে দরজা আস্তে আস্তে ধাক্কা দিতে থাকেন। প্রায় ৩০ মিনিট বাথরুমের ভেতরে ছিলেন তিনি।

ধীরে ধীরে ধাক্কার পর বাথরুমের দরজা খুলে যায়। সাড়ে ৩টার দিকে ভেতরে ঢুকতে সক্ষম হন তিনি। রুমে প্রবেশ করার সময় একটি শব্দ হয়। এটা ইউএনও টের পেয়ে যান। বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় ওয়াহিদা তার বাবাকে বলেন, ‘দেখো তো কোন বেয়াদব রুমে ঢুকেছে।’ এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে ইউএনও ওয়াহিদা খানম বিছানা থেকে উঠতে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তার গালে ও মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেন রবিউল। একপর্যায়ে ইউএনও বিছানায় ঢলে পড়েন। তার চিৎকারে পাশের রুম থেকে তার বাবা ওমর আলী শেখ এগিয়ে আসামাত্রই তাকেও ধাক্কা মেরে ফেলে দেন রবিউল। দরজার চৌকাঠের সঙ্গে ধাক্কা লাগায় তার বাবাও পড়ে গিয়ে আর উঠতে পারছিলেন না।

এ সময় কেন তার মেয়ের ওপর হামলা করা হচ্ছে- এমন প্রশ্নের পাশাপাশি প্রহরী নাদিম হোসেন পলাশকে একাধিকবার ডাক দেন ইউএনওর বাবা। এদিকে রবিউল একপর্যায়ে আলমারির চাবির কথা বললে ওমর আলী শেখ চাবি রাখার স্থান বলে দেন। ওই চাবি নিয়ে ঘর থেকে ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন রবিউল। সাড়ে ৪টার দিকে বের হয়ে যান তিনি। প্রাচীর টপকে রাস্তা দিয়ে সোজা মহাসড়কে যান তিনি। এরই মধ্যে ঢাকা থেকে দিনাজপুরের উদ্দেশে ছেড়ে আসা কোচে উঠে দিনাজপুরে চলে যান রবিউল। বাসায় ফিরে সকালের নাশতা খেয়ে ডিসি অফিসের নাজিরের কাছে যান তিনি। সব কিছু স্বাভাবিকভাবে করছিলেন রবিউল।

সূত্র জানায়, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, রবিউল ইউএনওর বাসায় ঢোকার সময় একটি লাঠি তার হাতে ছিল। রবিউল দাবি করেন, ইউএনওর কার্যালয়ের আশপাশে অনেক কুকুর রয়েছে। কুকুর তেড়ে এলে যাতে লাঠি দিয়ে পেটাতে পারেন, তাই সঙ্গে লাঠি রেখেছিলেন তিনি।

জিজ্ঞাসাবাদে রবিউল জানান, মাস চারেক আগে ইউএনওর ব্যাগ থেকে ১৬ হাজার টাকা চুরি হয়। ওই টাকা পরে তাকে ফেরত দিতে হয়। এ ঘটনায় যাতে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় বা শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, সে ব্যাপারে অনুরোধ করেছিলেন ইউএনওকে। এর পরও তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং বিভাগীয় মামলা করা হয়। এদিকে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর তিনি ১৭ হাজার টাকা বেতনের স্থলে ৯ হাজার টাকা করে পাচ্ছিলেন। এটা দিয়ে সংসার চালানো মুশকিল হয়ে পড়েছিল তার। তিনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। আবার জুয়া খেলেও অনেক টাকা ঋণ হয় তার। এর পরই পরিকল্পনা করেন ইউএনওর ওপর হামলা করবেন।

রবিউল পুলিশকে জানান, ইউএনও ও তার বাবার ওপর হামলার পর ওই বাসা থেকে ৫০ হাজার টাকা চুরি করে দিনাজপুরের বিরলের জনৈক খোকনের হাতে দেন। খোকন ক্রিকেট জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইউএনওর ওপর হামলার ঘটনায় মামলায় সাক্ষী হিসেবে খোকনের জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জুয়ার সঙ্গে জড়িত থাকায় খোকনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ।

রবিউল এও জানান, ইউএনওর ব্যাগ থেকে টাকা চুরি করার কিছুদিন পর তার বাসায় গিয়ে ইউএনও এবং তার বাবার কাছে ক্ষমা চান তিনি। তবে তারা ক্ষমা করেননি। এ নিয়ে তার মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়।

এর আগে ৪ সেপ্টেম্বর র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয় স্থানীয় যুবলীগ নেতা আসাদুল হক ও তার দুই সহযোগী নবীরুল ইসলাম ও সান্টু কুমার বিশ্বাস। তখন র‌্যাব দাবি করেছিল, ‘তারা এ ঘটনার ছায়া তদন্ত করেছে। গ্রেপ্তার আসাদুল নিজের জড়িত কথা স্বীকার করেছেন। এ ঘটনার মূল আসামি তিনি। পূর্বপরিকল্পিতভাবে চুরির করার উদ্দেশ্যে তারা ইউএনওর বাসায় ঢুকেছিলেন।’ এখন পুলিশের হাতে রবিউল ধরা পড়ার পর তদন্ত নতুন মোড় নিল। রবিউলকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সব প্রশ্নের জট খুলছে। তার দেওয়ার তথ্যের ভিত্তিতে মিলছে সব আলামতও।








Leave a reply