মিরপুরে আবার শাহাদাত আতঙ্ক

|

রাজধানীর মিরপুরে নতুন মিশনে নেমেছেন পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত হোসেন। ঝুট ব্যবসা থেকে রিকশার গ্যারেজ, সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া তিনি। এজন্য নতুন করে গড়ে তুলেছেন শুটার গ্রম্নপ। আগে থেকে সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সম্প্রতি তার কাজে বাধা দেওয়ায় পলস্নবীর দুই নেতাকে খুন করারও পরিকল্পনা করে। এর মধ্যে একজন জনপ্রতিনিধিও রয়েছেন; কিন্তু তার আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। তার শুটার গ্রম্নপের ৫ সদস্যকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের পর চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে বলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

সূত্রমতে, মিরপুর আন্ডারওয়ার্ল্ডে শাহাদাতের স্থান দখলে মরিয়া কারাবন্দি ভাসানটেকের শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার আব্বাসের সহযোগীরা। একই সঙ্গে মিরপুর-৬ ও ১১ নম্বরের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী (নেপালে পলাতক) দুই ভাই মামুন-জামিল এবং কাফরুলের ইব্রাহিমও এখন পাত্তা দিতে চায়না শাহাদাতকে। অথচ এরাই একসময় শাহাদাতের হয়ে কাজ করত। এ কারণে নতুন করে উঠতি বয়সি ও দলছুট সন্ত্রাসীদের দলে টেনে গ্রম্নপ ভারি করার চেষ্টা করছে শাহাদাত। কথায় কথায় গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করাই তার ক্যাডারদের একমাত্র লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহাদাত হোসেন সোমা যায়যায়দিনকে বলেন, ভারতে বসে নতুন করে মিরপুরের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত। এজন্য তিনি গড়ে তুলেছেন আলাদা আলাদা শুটার গ্রম্নপ। ব্যবসায়ীরা তার কথা না শুনলে এ শুটার গ্রম্নপের সদস্যরা তাদের বাসা অথবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে আসে। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই তার কথামতো গোপনে টাকা পৌঁছে দেয় তার লোকজনের কাছে। পরে ওই টাকা তার সহযোগীরা ভারতে পৌঁছে দেন। সম্প্রতি এই চক্রের ৫ সদস্যকে অস্ত্র ও গুলিসহ গ্রেপ্তারের পর এমনই তথ্য পাওয়া গেছে। তারা ইতোমধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দিয়েছেন। এ বিষয়ে আরও কয়েকজন সদস্যের নাম পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যহত রয়েছে।

তিনি বলেন, মিরপুরে আন্ডারওয়ার্ল্ড বলতে এখন কিছুই নেই। আগের সন্ত্রাসীদের নাম ভাঙ্গিয়ে

অনেকেই চলার চেষ্টা করে। এ নিয়ে শাহাদাতের সঙ্গে ওই এলাকার অন্য সন্ত্রাসীদের দূরত্ব বেড়ে যায়। যার কারণে শাহাদাত এখন দল ভারি করার জন্য নানা ধরনের চেষ্টা অব্যহত রেখেছে। কিন্তু ডিবির অভিযানের পর তার নেটওয়ার্ক অনেকটাই স্তিমিত।

ডিবি সূত্র জানায়, মিরপুরে ঝুট, পরিবহণ, গার্মেন্ট ও ব্যাটারিচালিত রিকশার গ্যারেজ থেকে প্রতি মাসেই কোটি কোটি টাকা চাঁদা উঠানো হয়। এই টাকার একটি অংশ স্থানীয় সন্ত্রাসীসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লোকজনের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হতো। সেখান থেকে একটি অংশ পাঠানো হয় ভারতে পালিয়ে থাকা সন্ত্রাসী শাহাদাতের কাছে। সম্প্রতি ওই টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেয় ঢাকা মহানগর উত্তরের পলস্নবী থানা যুবলীগের সভাপতি মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পী (৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর) ও সাধারণ সম্পাদক (বহিষ্কৃত) জুয়েল রানা। এরপর তাদের খুন করার পরিকল্পনা করা হয়। কয়েক ভাগে দায়িত্ব দেওয়া হয় একাধিক ব্যক্তিকে। প্রথম অবস্থায় বাসায় গুলি করে ভয়ভীতি দেখানো হয় ওই নেতাদের। এরপরও শাহাদাতের কথা না শোনায় হত্যার দায়িত্ব দেওয়া হয় কিলার রনি, তপন, যুবরাজ, শফিকুল, মুন্না, শাহজাদা, সোহাগ ও হাসানকে। বিষয়টি টের পেয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের জানান ওই দুই নেতা। এরপর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। তাদের গ্রেপ্তারে মাঠে নামে ডিবির একাধিক টিম।

একপর্যায়ে গত মাসের মাঝামাঝিতে গ্রেপ্তার করা হয়, রফিকুল ইসলাম রনি, মনির হোসেন বাবু, সাইফুল ইসলাম, শাহিন মিয়া ও সোহেল রানাকে। এসময় তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও ৪টি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এরপর তাদের রিমান্ডে এনে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেন ডিবি সদস্যরা। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সোহাগ ও হাসান দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।

ডিবি কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রনি যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি। অন্য সদস্যদের নামেও একাধিক মামলার অস্বিত্ব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কাফরুল থানায় তিনটি এবং পলস্নবী ও ভাসানটেকে দুটি হত্যা মামলা রয়েছে। এসব হত্যাকান্ডের নেপথ্যে রয়েছে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজি। এছাড়া চাঁদাবাজি ও মারধরের ঘটনায় তাদের নামে পলস্নবীতে সাতটি ও রূপনগরে একটি মামলা রয়েছে। এ চক্রের সদস্যদের ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে নানা খাতে চাঁদাবাজি- সবখানেই তাদের উপস্থিতি পাওয়া। কেউ কথা না শুনলে গুলি করাই তাদের প্রধান কাজ। মিরপুরের তাদের ‘শুটার গ্রম্নপ’ হিসেবে সবাই এক নামেই চেনে। তারা সবাই শাহাদাতের লোক বলে সর্বমহলে পরিচিতিও রয়েছে। এ কারণে সবাই তাদের সমীহ করে চলেন। রাজধানীর মিরপুরের সাত থানা এলাকায় নিয়ন্ত্রণে এই শুটারদের ব্যবহার করে শাহাদাত। এই দলের অন্যতম সদস্য তপন সীমান্ত পাড়ি দিলেও অন্যতম আরেক সদস্য শুটার মহসীন ঈদের আগের্ যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়।

সূত্রমতে, বৃহত্তর মিরপুরে শাহাদাত ছড়ি ঘোরালেও সেখানে এলাকা অনুযায়ী আলাদা নিয়ন্ত্রক রয়েছে। কারাবন্দি সন্ত্রাসী কিলার আব্বাসের নিয়ন্ত্রণে আছে কাফরুল, ভাসানটেক, মাটিকাটা, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া। শাহাদাতের সহযোগী মোক্তারের নিয়ন্ত্রণে মিরপুর-১, ২, ৬, ১১, পলস্নবী ও রূপনগরের ঝুট ব্যবসা। মোক্তার এখন ভারতে পালিয়ে আছে বলে ধারণা গোয়েন্দাদের। ভাসানটেক ও মিরপুর-১৪ নম্বর সেকশনে আধিপত্য ইব্রাহিমের। মামুন ও জামিল দুই ভাই নিয়ন্ত্রণ করে মিরপুর-৬ ও ১১ নম্বর সেকশন। তারা এখন নেপালে অবস্থান করছে বলে তথ্য রয়েছে। আর কাফরুলের নিয়ন্ত্রক শাহীন শিকদার। এছাড়া শাহাদাতের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মধ্যে রয়েছে আড্ডু, তপু, চাঁন ও বাবু। তারা শাহাদাতের বিভিন্ন নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে ও চাঁদার টাকার ভাগ পাঠিয়ে দেয়। আড্ডুর সহযোগী হিসেবে রয়েছে নাটা বিপস্নব। আবার মামুনের সহযোগী হলো বাবু। তারও দুই সহযোগী রয়েছে- লিংকন ও আকরাম। এদিকে জামিলের তিন সহযোগী হলো- হিরণ, জনি ও ইয়াছিন।

গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, একসময় কিলার আব্বাস ছাড়া সবাই শাহাদাতের সদস্য ছিল; কিন্তু শাহাদাত পালিয়ে যাওয়ার পর তার দলের সদস্যরা নিজেরাই নিজেদের মতো করে চাঁদাবাজি শুরু করে। সেখান থেকে একটি অংশ শাহাদাতকে পাঠানো হলেও সম্প্রতি তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে ক্ষিপ্ত হন তিনি। খোঁজখবর নিতে শুরু করেন। দেখা যায়, দুই নেতা রয়েছেন ওই তালিকায়। এরপর নেপালে পলাতক মামুন-জামিল ও শাহাদাত একযোগে দুই ভাইকে খুনের পরিকল্পনা করে। দায়িত্ব দেওয়া হয় মিরপুরের শাহাদাত ও মামুন-জামিলের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের। এদের মধ্যে একজন কিলিং মিশনের পরিকল্পনার খবর ফাঁস করে দেন কাউন্সিলর বাপ্পীর কাছে। এরপর প্রাণ বাঁচাতে নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি। বিষয়টি জানান পুলিশের মিরপুর বিভাগের ডিসিসহর্ যাব-ডিবির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের। এরপর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। শুরু হয় বস্নক রেইড। মিরপুরের কালশী কবরস্থান এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মামুন-জামিল গ্রম্নপের রফিকুল, শহিদুল ও মোশাররফকে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় দুটি পিস্তল, চার রাউন্ড গুলি ও ওজন মাপার যন্ত্রের মতো একটি ডিভাইস। সেই ডিভাইস বিস্ফোরণ ঘটে পলস্নবী থানার ভেতরে।








Leave a reply