দুর্বল কোম্পানির দাপট!

|

তলানিতে থাকা পুঁজিবাজার নিয়ে আশার আলো দেখাচ্ছেন অনেকেই। বাজারকে শক্তিশালী করতে নেয়া হচ্ছে নানা সিদ্ধান্তও। বাতিল হচ্ছে দুর্বল কোম্পানির তালিকাভুক্তি। কিন্তু এসব পদক্ষেপের পরও থামেনি ‘পচা’ কোম্পানির দৌরাত্ম্য। গত মাসেও বেশকিছু দুর্বল কোম্পানির মুনাফা ছিল চোখ ধাঁধানো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পোর্টফোলিওর মুনাফা ছিল ৫০ শতাংশের বেশি। যার নেপথ্যে জুয়াড়িদের কারসাজি দেখছেন অনেকেই। এই প্রেক্ষাপটে পুঁজিবাজারে ‘পচা’ শেয়ারের দৌরাত্ম্য থামাতে ইতোমধ্যে ২২ কোম্পানিকে শুনানিতে ডেকেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

যৌক্তিক কারণ দর্শাতে না পারলে তাদের ব্যাপারে নেয়া হতে পারে কঠোর সিদ্ধান্ত। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ নিলেই হবে না, আইনের আওতায় আনতে হবে পুঁজিবাজার কেন্দ্রিক জুয়াড়ি ও কারসাজি চক্রকে। নয়তো বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে না।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত এক মাস ধরে পুঁজিবাজার ছিল গতিশীল। বাজারের সূচকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লেনদেনের পরিমাণ। ৩শ কোটির লেনদেন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, সূচক ছাড়িয়েছে ৫ হাজারের কোটাও। কিন্তু এর মধ্যে থেমে নেই কারসাজি চক্র। দুর্বল কোম্পানিকে টার্গেট করে মুনাফালোভীরা সক্রিয় ছিল বাজারে। বছরের পর বছর বিনিয়োগকারীদের মুনাফা না দেয়া কোম্পানিরও শেয়ারের দর বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। আলোচ্য সময়ে দুর্বল কোম্পানি দৌরাত্ম্য ছিল চোখে পড়ার মতো।

এক মাসের ব্যবধানে স্বল্প মূলধনী কোম্পানি জিল বাংলা সুগার মিলের শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় শতভাগের কাছাকাছি। গতকাল রবিবার দিনের লেনদেন শেষে জিলবাংলা সুগার মিলের শেয়ারদর ছিল ১৯৮ টাকা- যা ১৩ আগস্টে ছিল ৯৭.৮ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে ১০০ টাকা। অথচ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন মাত্র ৬ কোটি টাকা। আরেক স্বল্প মূলধনী কোম্পানি শ্যামপুর সুগার মিলের পরিশোধিত মূলধন হলো ৫ কোটি টাকা। কিন্তু প্রায়ই শেয়ারদর বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনায় আসে কোম্পানিটি। গতকাল কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৭৮.৮ টাকায়- যা ১৩ আগস্টে ছিল ৪৭.১ টাকা। অর্থাৎ মাসের ব্যবধানে শ্যামপুর সুগার মিলের শেয়ারদর বেড়েছে ৩১.৭ টাকা। আরেক কোম্পানি আনোয়ার গ্যালভানাইজিংয়ের শেয়ারদরও বেড়ে চলেছে। গতকালও কোম্পানিটির শেয়ার সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ১২৫.৩ টাকায়। অথচ গত ১৩ আগস্ট কোম্পানির শেয়ারদর ছিল ৮২ টাকা। মাসের ব্যবধানে কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে ৪৩.৬ টাকা। এমনি আরেক স্বল্প পুঁজির কোম্পানি দুলা মিয়া কটন। ৭ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের এই কোম্পানির শেয়ারদরও বেড়েই চলেছে। গতকাল কোম্পানির প্রতিটি শেয়ার ৯৩.৫ টাকায় লেনদেন হয়েছে। অথচ এক

মাস আগেও এই কোম্পানির শেয়ারদর ছিল ৬৬.৭ টাকা। মাসের ব্যবধানে নাম সর্বস্ব এই কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে ২৬.৮ টাকা। এছাড়া হাক্কানী পাল্প এন্ড পেপার মিল, ফাইন ফুডস, বিডি ফাইন্যান্স, সাভার রিফেক্টোরিজ, ফুয়াং সিরামিক, জিকিউ বলপেনসহ আরো অনেক দুর্বল কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েই চলেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত¡বধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, যেসব কোম্পানির দাম অস্বাভাবিকহারে বাড়ছে তা খতিয়ে দেখতে হবে। যদি রেশিও অনুযায়ী বাড়ে তবে ঠিক আছে। কিন্তু এর বাইরে হলে স্টক এক্সচেঞ্জ ও বিএসইসির খতিয়ে দেখা উচিত বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দুর্বল কোম্পানির শেয়ারদর যে হারে বাড়ছে, সেই হারে বাড়ছে না মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানির শেয়ার দর। দেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় কোম্পানি গ্রামীণ ফোনের প্রতিটি শেয়ার গতকাল রবিবার সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ৩৫২.৮ টাকায়। যা গত ১৩ আগস্ট ছিল ২৯০ টাকা। অর্থাৎ মাসের ব্যবধানে ১ হাজার ৩৫৫ কোটি পরিশোধিত মূলধনের এ কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে ৬২ টাকা। আরেক বড় কোম্পানি স্কয়ার ফার্মার শেয়ারদর সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ২১৫.৯ টাকায়- যা গত ১৩ আগস্টে ছিল ২০২.৬ টাকা। অর্থাৎ মাসের ব্যবধানে ‘ব্লু -চিপ’ হিসেবে চিহ্নিত এই কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে মাত্র ১৩.৩ টাকা। অথচ ৮৪৪ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের এই কোম্পানিটি বছরজুড়েই ভালো ব্যবসা করছে। রাষ্ট্রাংয়ত্ত কোম্পানি তিতাস গ্যাসের শেয়ার গতকাল সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ৩৫.২ টাকায়, যা একমাস আগে ছিল ৩২.২ টাকা। ৯৮৯ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানিটির শেয়ারদর মাসের ব্যবধানে বেড়েছে মাত্র ৩ টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত আরেক কোম্পানি পাওয়ার গ্রিডের সর্বশেষ শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৫২.৪ টাকা- যা এক মাস আগে ছিল ৪৯.৮ টাকা। অর্থাৎ মাসের ব্যবধানে ৭১২ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে মাত্র ২.৬ টাকা।

এসব বিষয়ে কথা হয় পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদের সঙ্গে। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, যে হারে দুর্বল কোম্পানির দৌরাত্ম্য বাড়ছে তা পুঁজিবাজারের জন্য বিপজ্জনক। দুর্বল কোম্পানির দাম বাড়ার কারণে পুঁজিবাজারের সূচকও বেড়েছে। এখনি দুর্বল কোম্পানির দৌরাত্ম্য না থামাতে পারলে পুঁজিবাজারের বর্তমান ব্যবস্থা টেকসই হবে না। তাই বিএসইসিকে এখনি এসব কোম্পানিকে নজরদারির আওতায় এনে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর যারা পুঁজিবাজারে কারসাজির চেষ্টা করছে বা অতি তাড়াতাড়ি ধনী হওয়ার চেষ্টায় আছে তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার পক্ষেও মত দেন এই অর্থনীতিবিদ।

ডিএসই ব্রোকারেজ এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি শাকিল রিজভী ভোরের কাগজকে বলেন, পচা কোম্পানির বিষয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সচেতন থাকতে হবে। মৌলভিত্তি সম্পন্ন যেসব কোম্পানি ভালো ডিভিডেন্ড দেয়, সেসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করতে হবে। পচা কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে আরো ঝুঁকি বেড়ে যাবে।

দুর্বল কোম্পানির দৌরাত্ম্যের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির মুখপাত্র রেজাউল করিম ভোরের কাগজকে বলেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়নে কমিশন কাজ করছে। ইতোমধ্যে বিএসইসি ২২ কোম্পানিকে শুনানিতে ডেকেছে। তাদের কাছে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাওয়া হবে। পুঁজিবাজারে সুশাসন নিশ্চিত করতে বিএসইসি কাজ করে যাচ্ছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।








Leave a reply