দুই দশক জেল খেটে নির্দোষ, ‘ক্ষতিপূরণ এনে দিতে পারবেন?’

|

১৯৯৮ সালে রাজধানীর লালবাগের ব্যবসায়ী আবদুল আজিজ চাকলাদারকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচারকাজ রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে দীর্ঘ দেড়যুগ বন্ধ ছিল। সাক্ষী না থাকায় পরে এক আসামি এ মামলার রাজসাক্ষী হন।

২০১৯ সালে ঢাকার ৯ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক শেখ হাফিজুর রহমানের আদালতে মামলাটি এলে মাত্র সাত মাসে তিনি এ মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন করেন। ঘটনার ২২ বছর পর আজ সোমবার মামলাটি নিষ্পত্তি হয়।

রায়ে এক সময়ের ত্রাস খুলনার এরশাদ শিকদারের সহযোগী আসামি জয়নালের মৃত্যুদণ্ড এবং আরেক আসামি রুস্তম আলীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া দুই আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। রায় শুনে খালাসপ্রাপ্ত আসামি জামাই ফারুক ও জামাই ইদ্রিস কান্নায় ভেঙে পড়েন।

খালাসপ্রাপ্ত আসামি জামাই ফারুক দুপুরে এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘রায়ে আমি খুশি, রাষ্ট্রের কাছে আমার কোনো দাবি নেই।’ এ বলেই কেঁদে ফেলেন তিনি।

জামাই ফারুক আরো বলেন, ‘আমি অপরাধ না করেও ২০ বছর কারাগারে আটক ছিলাম। আমার ক্ষতিপূরণ কি আপনারা এনে দিতে পারবেন?’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার ওপরে কেউ অবিচার করলে, তার বিচার আল্লাহ করবেন।’

অপর আসামি জামাই ইদ্রিস বলেন, ‘আমি অপরাধ না করেও ২১ বছর কারাগারে আটক ছিলাম। আদালত যা দেওয়ার দিয়েছেন, আমরা এ নিয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য করতে চাই না।’

আদালতে এই মামলার সরকার পক্ষে ছিলেন বেলায়েত হোসেন ঢালী এবং আসামিপক্ষের আইনজীবী ছিলেন আবদুল খালেক।

রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বেলায়েত হোসেন ঢালী এনটিভি অনলাইনকে বলেন, রায়ে বিচারক এরশাদ শিকদারের সহযোগী আসামি জয়নালের মৃত্যুদণ্ড এবং আরেক আসামি রুস্তম আলীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। এ ছাড়া তাঁদের ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সে জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে আসামিদের আরো ছয় মাস কারাদণ্ড ভোগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এ মামলায় প্রধান আসামি এরশাদ শিকদারের অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় এবং দ্বিতীয় আসামি লিয়াকত মামলা চলাকালে মারা যাওয়ায় অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

পিপি আরো বলেন, এ ছাড়া মামলার আরো দুই আসামি জামাই ফারুক ও জামাই ইদ্রিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাঁদের মামলা থেকে খালাস দিয়েছেন। খালাসপ্রাপ্ত দুই আসামি ২০ বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে রয়েছেন। তবে দণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি জয়নাল ও রুস্তম আলী পলাতক রয়েছেন। এ ছাড়া এ মামলার তিন নম্বর আসামি একমাত্র রাজসাক্ষী হওয়ায় নুরে আলমকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

এর আগে গত ১৪ জানুয়ারি বিচারক শেখ হাফিজুর রহমান রায়ের জন্য ১৯ ফেব্রুয়ারি দিন নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু সেদিন রায় প্রস্তুত না হওয়ায় বিচারক গত ১ এপ্রিল রায়ের জন্য নতুন দিন নির্ধারণ করেছিলেন। সেদিন করোনাভাইরাসের কারণে আদালত বন্ধ থাকায় আর রায় দেওয়া হয়নি। তাই আদালত আজ রায় ঘোষণা করেন।

মামলার বিবরণে জানা যায়, রাজধানীর লালাবাগ থানার বাসিন্দা ছিলেন আবদুল আজিজ চাকলাদার। এরশাদ শিকদার আজিজের মাধ্যমে রাজধানীতে বাড়ি ও প্লট কিনেছিলেন। কিন্তু পুলিশের কাছে এসব তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার সন্দেহে ১৯৯৮ সালে ৫ মার্চ আজিজ চাকলাদারকে খুলনা ডেকে নিয়ে যান এরশাদ শিকদার। আবদুল আজিজ চাকলাদার বাসায় এক সপ্তাহ পর ফিরে আসবেন বলে যান। কিন্তু বাসায় ফিরে না আসায় আজিজের ভাই বাচ্চু মিয়া বাদী হয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে নিখোঁজের দেড় বছর পর এরশাদ শিকদার পুলিশের হাতে ধরা পড়লে ২২টি খুনের কথা স্বীকার করেন। এর মধ্যে আবদুল আজিজ চাকলাদার হত্যার ঘটনাটিও ছিল। এরপর তদন্ত শেষে এ ঘটনায় এরশাদ শিকদারসহ সাতজনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। কিন্তু সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে মামলাটি দীর্ঘ দেড়যুগ ধরে পড়েছিল। পরে মামলার এক আসামি নুরে আলম রাজসাক্ষী হওয়ায় ঘটনার ২২ বছর পর বিচারকাজ সম্পন্ন হলো।

যেভাবে জামিন পান নুরে আলম

১২টি হত্যাকাণ্ডে এরশাদ শিকদারের সহযোগী ছিলেন তাঁর দেহরক্ষী নুরে আলম। পরে তিনি এসব হত্যা মামলার রাজসাক্ষী হন এবং আদালতে এরশাদ শিকদারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন। তাঁর সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে খুলনার জলিল টাওয়ারের মালিকের ম্যানেজার খালিদ হত্যা মামলায় এরশাদ শিকদারের ফাঁসির আদেশ হয়। ওই মামলায় ২০০৪ সালের ১০ এপ্রিল মধ্যরাতে খুলনা জেলা কারাগারে তার ফাঁসি কার্যকর হয়। এভাবে একে একে ১১টি মামলায় রাজসাক্ষী হিসেবে কারাগারে থেকেই এরশাদ শিকদারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন নুরে আলম। বাকি ছিল রাজধানীর লালবাগের আজিজকে অপহরণ করে হত্যার মামলা। পুরাতন মামলা হিসেবে ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি হাইকোর্ট মামলাটি চার মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির আদেশ দেন।

এর আগে এ মামলায় এরশাদ শিকদারের দেহরক্ষী নুরে আলমকে কারাগার থেকে মুক্তির আদেশ দেন বিচারক। নূর আলম চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার আজিমপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ১৯৯৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে কারাগারে ছিলেন।

এদিকে নুরে আলম কারাগারে থাকা অবস্থায় তাঁর ছেলে রাফী (১৮) মারা যান এবং স্ত্রীও তাঁকে ছেড়ে চলে যায়। নূরে আলমের বাড়ি, জমি কিছুই নেই। তিনি প্রথম জীবনে জাহাজে চাকরি করতেন। সেই চাকরি ছেড়ে এরশাদ শিকদারের দেহরক্ষী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন।

এরশাদ শিকদারের গ্রেপ্তার ও ফাঁসি কার্যকর

১৯৯৯ সালের নভেম্বরে গ্রেপ্তার হন এরশাদ শিকদার। তখন তার নামে ৪৩টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর বেশিরভাগই হত্যা মামলা। নিম্ন আদালতের বিচারে সাতটি হত্যা মামলায় তার ফাঁসির আদেশ হয় এবং চারটি মামলায় যাবজ্জীবন সাজা হয়। তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেন। রাষ্ট্রপতি তাঁর আবেদন নাকচ করে দেন এবং ২০০৪ সালের ১০ মে মধ্যরাতে খুলনা জেলা কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। পরে টুটপাড়া কবরস্থানে তাঁর লাশ দাফন করা হয়।








Leave a reply