তিস্তার ভাঙনে দিশাহারা লালমনিরহাটের মানুষ

|

তীব্র ভাঙনে দিশাহারা লালমনিরহাটের তিস্তাপাড়ের মানুষ। গত ৪ দিনে তিস্তার পেটে বিলীন হয়েছে একটি গ্রামের শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি, ঈদগা মাঠ ও ফসলি জমি। হুমকির মুখে রয়েছে বিদ্যালয়সহ আরো বিভিন্ন স্থাপনা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জুন থেকে থেমে থেমে বন্যার কবলে পড়ে তিস্তা নদীর বাম তীরের লালমনিরহাটের ৫টি উপজেলা। বন্যার পানি কমতে শুরু করলে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। আগস্টের শেষ থেকে এখন পর্যন্ত বড় বন্যা না হলেও তিস্তার পানিপ্রবাহ ওঠানামা করছে। পানি কমলে ভাঙন শুরু হয়। তিস্তার ভাঙনে বাম তীরে ৫টি উপজেলায় প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ঈদগা মাঠ, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, স্থাপনা ও ফসলি জমি। মাঝেমধ্যে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। চোখের সামনে ভেসে যায় বসতভিটা ও আসবাবপত্র। ঘরবাড়ি সরানোর মতো সুযোগও পাচ্ছেন না কেউ কেউ।

জেলার ৫টি উপজেলায় ভাঙন দেখা দিলেও কয়েক দিন ধরে তীব্র ভাঙনের মুখে পড়ে আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের দক্ষিণ বালাপাড়া গ্রাম। গত ৫ দিনে গ্রামটির শতাধিক বসতভিটা ও ঐতিহ্যবাহী আহলে হাদিস ঈদগা মাঠ বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের মুখে পড়েছে গোবর্ধন ইসমাইলপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভাঙন অব্যাহত থাকলে দুয়েক দিনের মধ্যে গ্রামটির একমাত্র বিদ্যালয়টিও ভেঙে যাবে বলে শঙ্কিত এলাকাবাসী।

দ্রুত ভাঙনরোধে ব্যর্থ হলে শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। সিঙ্গিমারী, পাসাইটারী গ্রামটি বিলীন হওয়ায় তিস্তা নদীর পানি এখন ধাক্কা দিচ্ছে ওয়াপদা বাঁধে। ফলে বাঁধটিও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এ বাঁধটি বিলীন হলে শত শত একর জমি অনাবাদি হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে ভাঙনের মুখে পড়বে কয়েক হাজার পরিবার ও সরকারি বেসরকারি বেশ কিছু স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান। তিস্তা নদীর তলদেশ ভরাট হওয়ায় সামান্যতে বন্যা আর ভাঙনের মুখে পড়েন তিস্তাপাড়ের মানুষ। তাই তিস্তা নদী খনন করে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছে নদীপাড়ের মানুষ।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগের পাইলিং দিয়ে বাঁধের কাজ করা হলেও তার মান নিয়ে অভিযোগ রয়েছে নদীপাড়ের মানুষের। নদীর তীরে বোমা মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করে জিও ব্যাগে ভরে নদীতে ফেলা হচ্ছে। সপ্তাহ না যেতেই সেই জিও ব্যাগ গড়িয়ে বোমা মেশিনের গর্তে পড়ে ভরাট হচ্ছে। একই সঙ্গে নদী পাড়ে বোমা মেশিন বসানোর কারণে নদী ভাঙনও বেড়েছে কয়েক গুণ। যেখানে বোমা মেশিন বসানো হচ্ছে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেই স্থানে ভাঙন দেখা দিচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত দক্ষিণ বালাপাড়া গ্রামের আবু বক্কর ও মনসুর আলী বলেন, চোখের সামনেই সব কিছু ভেসে গেল। ঘরগুলো টিন খুলে সরানো সম্ভব হলেও অনেক আসবাবপত্র তিস্তায় ভেসে গেছে। টিন খুলে রাস্তায় রেখেছি। জমি নেই বাড়ি করার। কোথায় যাব আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না।

একই এলাকার শাহ আলম, সোলেমান আলী গোলজার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শুনছি নদীর বাঁধ দেবে সরকার। সেই বাঁধ তো দূরের কথা নেতাদেরও দেখা যাচ্ছে না। হামরা নদীতে ভাসি যাচ্ছি মেম্বার, চেয়ারম্যান ও এমপি-মন্ত্রীদের দেখা নাই। আগে নদী ভাঙাদের টিন ও টাকা দিত। এবার সেই টিনও নাই। হামরা ত্রাণ চাই না, নদী খনন করে স্থায়ী বাঁধ চাই।

বসতভিটা হারিয়ে শত শত পরিবার রাস্তার ধারে খোলা আকাশে মানবেতর জীবনযাপন করছে। সরকারিভাবে তাদের পুনর্বাসনের আশ্বাস দেয়া হলেও তা করা হয়নি। গত মাসে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের বরাদ্দ চেয়ে তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত এসব পরিবারকে পুনর্বাসনের বরাদ্দ আসেনি। যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরাদ্দ এলে বিতরণ করা হবে বলে জেলা ত্রাণ শাখা নিশ্চিত করেছে।

লালমনিরহাট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, জেলার ৫টি উপজেলায় ৭৫৯টি পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবারকে পুনর্বাসন করতে টিন ও টাকা বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। বরাদ্দ এলে তা বিতরণ করা হবে। প্রতিনিয়তই নদীর পাড় ভাঙছে। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকাও প্রতিদিন বাড়ছে বলে জানান তিনি।








Leave a reply