তালেবান ঘাঁটিতে বিমান হামলা, বহু মানুষের প্রাণহানি

|

আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কুন্দুজ প্রদেশে আফগান বাহিনীর বিমান হামলায় কমপক্ষে ১২ জন তালেবান সদস্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ১২ জন। স্থানীয় সময় শনিবার এই হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, বিমান হামলায় অন্তত ৪০ তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। তবে এসময় কোনও বেসামারিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন কি না তা নিশ্চিত করেনি কর্তৃপক্ষ। তারা জানিয়েছেন, দুই পক্ষের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনার মধ্যেই তালেবান ঘাঁটিতে হামলার ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে।

ফাতিমা আজিজ নামে এক সংসদ সদস্য বলেন, প্রথম হামলাটি তালেবান ঘাঁটিতে আঘাত করেছিল। কিন্তু দ্বিতীয় হামলার সময় ঘটনাস্থলে বেসামরিক নাগরিকরা জড়ো হওয়ায় তাদের মধ্যে হতাহতের ঘটনা ঘটে। তিনি জানান, হামলায় কুন্দুজের খানাবাদ জেলার ১১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং পাঁচজন নিখোঁজ রয়েছেন।

তবে ঘটনার এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, বিমান হামলায় শিশুসহ অন্তত ১২ জন নিরীহ মানুষ নিহত এবং আরও ১৮ জন আহত হয়েছেন। হামলায় একাধিক তালেবান যোদ্ধা প্রাণ হারিয়েছেন বলেও দাবি করেছেন তিনি।

প্রায় দুই দশক ধরে চলমান যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে গত সপ্তাহে কাতারের রাজধানী দোহায় শান্তি আলোচনায় বসেছেন আফগান সরকার ও তালেবান প্রতিনিধিরা।

তালিবান (পশতু ভাষায়: طالبان, তালেবান-ও ব্যবহৃত হয়) সুন্নি ইসলামী এবং পশতুন জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে এই আন্দোলনের নেতারা ক্ষমতাসীন ছিলেন। ২০০১ সালে নর্দার্ন অ্যালায়েন্স এবং ন্যাটো দেশগুলো কর্তৃক পরিচালিত এক যৌথ অভিযানের মাধ্যমে সেদেশে তালিবান শাসনের অবসান ঘটানো হয়, তালিবান নেতারা অনেকেই বন্দী হন, বাকিরা পালিয়ে যান। “তালিবান” শব্দের অর্থ “ছাত্র”। বর্তমানেও দৃঢ় চেতনার অধিকারী তালিবান সমর্থকেরা পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তের উপজাতীয় অঞ্চলে ক্ষমতাসীন আফগান সরকার, অপারেশন এন্ডিউরিং ফ্রিডম-এ অংশগ্রহণকারী ন্যাটো সৈন্যবাহিনী এবং ন্যাটো পরিচালিত ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাসিস্টেন্স ফোর্সের (আইএসএএফ) বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।

তালিবান আন্দোলনের প্রধান ছিলেন মোল্লা মুহাম্মাদ উমার। উমারের পরেই ছিল সামরিক কমান্ডার ও মাদ্রাসা শিক্ষকদের একটি মিশ্র ইউনিটের অবস্থান। এর পরে স্থান ছিল পদমর্যাদা অনুযায়ী পাকিস্তানের বিভিন্ন ধর্মীয় বিদ্যালয়ে পাঠ গ্রহণকারী ব্যক্তিদের। দক্ষিণ আফগানিস্তানের পশতুন অঞ্চল ও পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু অঞ্চলে তালিবান আন্দোলন সবচেয়ে ব্যাপক রূপ ধারণ করেছিল। এছাড়াও ইউরোপ ও চীন থেকে কিছু স্বেচ্ছাসেবক এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। তালিবানরা বিভিন্ন উৎস থেকে ভারী অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ সহযোগিতা লাভ করেছিল। পাকিস্তান সরকার বিশেষত ইন্টার-সার্ভিস ইন্টেলিজেন্স তালিবানদের সহায়তার জন্য অভিযুক্ত হয়েছে। এছাড়া পাকিস্তানে আফগান শরণার্থীদের জন্য নির্মীত মাদ্রাসাগুলো থেকে অনেকেই সশস্ত্র আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। এই মাদ্রাসাগুলো প্রতিষ্ঠা করেছিল জামিয়াত উলামা-ই-ইসলাম।

পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে তালিবানরা আফগান রাজধানী কাবুলে ক্ষমতাসীন ছিল। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে মাত্র তিনটি দেশ তাদেরকে স্বীকৃত দিয়েছিল: পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। মানবাধিকার লংঘনের জন্য আফগানিস্তান জাতিসংঘের স্বীকৃতি হারিয়েছিল এবং ইরান, ভারত, তুরস্ক, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ দেশ তালিবান শাসনের বিরোধিতা করেছিল এবং তালিবান বিরোধী আফগান নর্দার্ন অ্যালায়েন্সকে সাহায্য করেছিল।

ক্ষমতায় থাকার সময় তালিবানরা এযাবৎ কালের সবচেয়ে কঠোর মুসলিম শরিয়াহ্‌ভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। নারীদের প্রতি বিরূপ আচরণের জন্য তারা আন্তর্জাতিক মহলে অনেক নিন্দিত হয়েছিল। নারীদের বোরকা পরতে বাধ্য করা হতো, আট বছর বয়সের পর তাদেরকে চাকরি বা শিক্ষা লাভ করতে দেয়া হতো না। যারা পড়তে চাইতো তাদেরকে ভূগর্ভস্থ বিদ্যালয়ে পাঠানো হতো এবং কারও সাথে অনৈসলামিক অবস্থায় ধরা পড়লে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হতো। পুরুষ ডাক্তাররা তাদেরকে চিকিৎসা করতে পারতো না। একান্তই করাতে হলে, সাথে করে কোন পুরুষ আত্মীয় বা স্বামী নিয়ে আসতে হতো। এ কারণেই অনেকেই বিনা চিকিৎসায় কষ্টভোগ করতো। পুরুষ-নারী সবাইকেই তালিবান আইন ভঙ্গ করার জন্য কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হতে হতো।১৯৯৬ সালে তারা ক্ষমতায় আসার পর আফগানিস্তানে ইসলামি আমিরাত প্রতিষ্ঠা করে। হিসেবে ঘোষণা করে।২০০১ সালে নর্দার্ন অ্যালায়েন্স ও ন্যাটো জোটের যৌথ অভিযানে তালেবান সরকারের পতন হলেও পুরোপুরি শেষ করা যায় নি। বর্তমানে তারা শশক্তিশালী অবস্থানে আছে।২০২০ সালে আফগানিস্তান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে কিছু সেনা প্রত্যাহার করবে। তালিবান চুক্তির শর্তগুলো মানলে ১৪ মাসের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সব সেনা প্রত্যাহার করবে।








Leave a reply