সোনাদিয়ার চেয়ে মাতারবাড়ীতে সুবিধা বেশি

|

মহেশখালীর সোনাদিয়ার পরিবর্তে মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ বেশি বাস্তবসম্মত ও সম্ভাবনাময় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সোনাদিয়ার চেয়ে মাতারবাড়ী চ্যানেলের গভীরতা বেশি। সেখানে পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা কম। চলমান বিভিন্ন প্রকল্পের কারণেও সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে মাতারবাড়ী। ফলে সোনাদিয়া প্রকল্প থেকে সরে এসে সরকার সঠিক কাজটিই করেছে।

গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। ২০১২ সালে এ প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হলেও মূলত কাজের কোনো অগ্রগতি ছিল না। পাশাপাশি একই উপজেলার মাতারবাড়ীতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে গিয়ে সেখানে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরির সম্ভাবনাও দেখা দেয়। পরে চলতি বছরের ১০ মার্চ একনেক সভায় ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। আর গত সপ্তাহে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সোনাদিয়া প্রকল্প থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে আসে সরকার।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মইনুল ইসলাম সরকারের এ সিদ্ধান্তকে বাস্তবসম্মত উল্লেখ করে জানান, মাতারবাড়ী বন্দর বাস্তবায়নে ভূরাজনৈতিকভাবে সোনাদিয়ার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে না। ২০১২ সালে যখন চীন সোনাদিয়া বন্দর নির্মাণে অর্থায়ন করতে চেয়েছিল তখন তাতে আপত্তি ছিল ভারতের। মাতারবাড়ীর ক্ষেত্রে সেসব বিষয় আর থাকছে না। জাপানের অর্থায়নে মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য টার্মিনাল তৈরি হচ্ছে। একই নৌপথ ব্যবহারের সুবিধা কাজে লাগিয়ে মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পথও সুগম হয়েছে।

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের পরিচালক ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম জানান, জাপানের কাশিমা বন্দরের আদলে তৈরি করা হচ্ছে এই বন্দর। ১৯৬২ সালে সেখানে ছিল ধান ক্ষেত। আর এখন সেটি বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তিনি জানান, পরিকল্পনার প্রথম ধাপে রয়েছে দুটি টার্মিনাল নির্মাণ। সাধারণ পণ্যবাহী ও কনটেইনার টার্মিনালে বড় জাহাজ (মাদার ভ্যাসেল) ভিড়তে পারবে, যা এখন বাংলাদেশের কোনো বন্দরের জেটিতেই ভিড়তে পারে না। ২০২৬ সাল নাগাদ শেষ হবে এ কাজ। দ্বিতীয় ধাপে নির্মিত হবে তিনটি কনটেইনার টার্মিনাল। ২০১৬ সালে জাইকার একটি জরিপ থেকে এ চ্যানেলের সম্ভাবনার বিষয়টি উঠে আসে বলে জানান তিনি।

সোনাদিয়ার সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, সোনাদিয়াকে ‘ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া’ বা পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। তাই সেখানে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা ঠিক হতো না। সে তুলনায় মাতারবাড়ী বন্দর মানুষের বসতি থেকে বেশকিছুটা দূরে। এটি তীর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার ভেতরে খনন করে করা হবে। তাই পরিবেশগত ঝুঁকি কম। চট্টগ্রাম বন্দর কর্ণফুলী নদীর ওপর হওয়ায় সেখানে শুধু জোয়ারের সময়ই জাহাজ ঢুকতে বা বের হতে পারে উল্লেখ করে জাফর আলম বলেন, মাতারবাড়ীতে সেসব সমস্যা থাকবে না। তিনি জানান, মাতারবাড়ী বন্দর থেকে চকরিয়া পর্যন্ত ২৭ কিলোমিটার রাস্তা সরাসরি হাইওয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে। পাশাপাশি রেল যোগাযোগ স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।

এ প্রসঙ্গে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী জানান, মাতারবাড়ীতে আরো বেশি গভীর বন্দর তৈরির সুযোগ থাকায় সোনাদিয়ার পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে সরকার। মাতারবাড়ীতে ১৮ মিটার ড্রাফটের চ্যানেল পাওয়া যাবে। অথচ সোনাদিয়ায় সর্বোচ্চ ১৪ মিটার ড্রাফটের হতো। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দরে সেগুলো থাকবে না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর কোনোটিই গভীর সমুদ্রবন্দর নয়। ফলে বেশি গভীরতার কোনো জাহাজ জেটিতে ভিড়তে পারে না। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ২ হাজার টিইইউএস কনটেইনার নিয়ে বন্দরে ভিড়তে পারে। মাতারবাড়ীতে ৮ হাজার টিইইউএস কনটেইনারবাহী ১৬ মিটার ড্রাফটের মাদার ভেসেল ভেড়ার সুযোগ তৈরি হবে। প্রকল্পটির চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে। এর ডিজাইন ও লে-আউটসহ সব নকশা জাপানি বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে করা হচ্ছে।








Leave a reply