মেয়েদের প্রতি এ বৈষম্য ঘুচবে কবে

|

ছেলেমেয়ে নিয়ে যে বৈষম্য, তা হয়তো পৃথিবী ধ্বংসের আগ পর্যন্ত বদলাবে না। শুধু যে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মেয়েদের আলাদা করে দেখা হয় তা নয়, উন্নত বিশ্বের পশ্চিমা দেশগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়। এশিয়ানদের জন্ম হওয়ার আগেই বিচারের মাপকাঠিতে পিতামাতার মনেই তৈরি থাকে উচ্চাশার বীজ। নিতান্তই প্রথম সন্তান মেয়ে হলে প্রাপ্তির আনন্দ সবার মনেই থাকে আর যদি ছেলে হয়ে যায়, সেই সঙ্গে যোগ হয় অহংকার। একটা কথাই প্রচলিত আছে, ‘আমি ছেলের মা’।

আপাতদৃষ্টিতে আমরা ধরে নিই বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে। তাই ভেদাভেদ মুছে যাচ্ছে, আসলে কি তাই? খুব উন্নত মনের এবং শিক্ষিত দু’চারজন পাওয়া যায় ব্যতিক্রম, নতুবা সমাজের চিত্র পাল্টেছে খুব কম। যখনই গোটা সমাজের হিসেবটা দেখা হয় তখন পার্থক্য ধরা পড়ে। খুব কম লোক পাওয়া যাবে যে একমাত্র বা দুটি কন্যা সন্তান নিয়েই সন্তুষ্ট, নতুবা দেখা যায় ছেলে সন্তানের জন্য আক্ষেপ থেকেই যায়! একটা অতি সাধারণ পর্যবেক্ষণ হলো, আশপাশে যদি লক্ষ্য করেন দেখবেন, যাদের পর পর দুটি কন্যা সন্তান একমাত্র তাঁরাই তৃতীয় একটি বাচ্চার পরিকল্পনায় যান নতুবা না। পর পর দুটি ছেলে আছে এমন মা-বাবারা কখনোই একটি মেয়ের জন্য তৃতীয়বারের চিন্তাভাবনায় যান না। বরং বিধাতা যা দিয়েছেন তাই নিয়ে সুখী থাকেন। শুধু এই নীতিবাক্য ভুলে যান মেয়েদের বেলায়। এর মধ্যে ব্যতিক্রম যে নেই, তা নয়।

যুগে যুগে শুধু মেয়েদের জন্ম দেওয়ার অপরাধে কত মা যে চোখের পানি ফেলেছেন, কত নারীর সংসার ভেঙেছে, কতজন যে সতিনের ঘর করেছেন সে তো সবারই জানা। এই আধুনিক যুগেও ছেলে সন্তানের আশায় অনেকেরই চার-পাঁচটি মেয়ে আছে। আমার স্কুল জীবনের খুব ঘনিষ্ঠ বান্ধবী স্বামীর ভ্রমণ-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক ব্যবসা। তাঁকে প্রতি বছর হজে যেতে হয়। প্রতি বছরই হজ থেকে ফিরে উনি বলতেন, এই বার নিশ্চয় আল্লাহ বিমুখ করবেন না, একটা ছেলে হবে। এভাবে পঞ্চমবারের পর বান্ধবী শীতল বিদ্রোহ করল। কারণ আমার বন্ধুটি বিব্রত সব মহলে একটার পর একটা বাচ্চা নিয়ে।

যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমার নিজের অনেকগুলো বাচ্চা খুব পছন্দ। এয়ারপোর্টে প্রায়শই এমন বড় পরিবার দেখা যায়, আমার মনে হয় এও বিধাতার এক পরম দান। যাই হোক আমি কখনোই আমার বান্ধবীর মধ্যে কোনো সংকীর্ণতা দেখিনি বা মেয়েদের প্রতি অবহেলাও দেখিনি। ভদ্রলোকও মেয়েদের পড়ালেখায় সব বিষয়ে খুব উদার। আমির খানের দঙ্গল সিনেমার হানিকারক বাপুর মতো একটু হানিকারক বটে। বড় মেয়ে লন্ডনে পড়ালেখা করছে পদার্থবিদ্যায়, মেজটাও শুনেছি স্কলারশিপ নিয়ে লন্ডন পড়তে যাচ্ছে। হয়তো এই মেয়েগুলোই একদিন তাঁর ছেলে না থাকার দুঃখ ভুলিয়ে দেবে। তবুও কি ঘুচবে একটা ছেলে না থাকার দুঃখ? এবার বলি দেশের বাইরের কিছু গল্প যা আমাকে আশ্চর্য করেছিল এবং তখনও লেখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছিলাম। এখনো প্রায়শই এমন বৈষম্যের খবর চোখে পড়ে।

গত নভেম্বরে collage savings imbalance নামে একটা আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছে দা ওয়ালস্ট্রিট জার্নালে। দুটো গবেষণা হয়েছে ব্যাংকগুলোতে উচ্চতর শিক্ষার জন্য ছাত্র সঞ্চয়ের ওপর, ফলাফলগুলো নির্দেশ করে যে উচ্চতর শিক্ষার জন্য মেয়েদের তুলনায় পিতামাতারা ছেলেদের জন্য বেশি সঞ্চয় করছেন। যেখানে ছেলেদের জন্য সঞ্চয়ের পরিমাণ ৫৩% সেখানে মেয়ে সন্তানের জন্য মাত্র ৩২ %। এই গবেষণায় দেখা গেছে যে কয়েক দশক আগে একাডেমিক গবেষণায় একই রকম বৈষম্য ছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে আজও তা অব্যাহত আছে। এমনকি ছাত্র ঋণের জন্য আবেদনপত্রে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের ঋণ গ্রহণযোগ্যতা পায় অনেক বেশি।

সর্বশেষ আজ আর কোনো প্রতিকারের কথা বলছি না, শুধু এটা বলতে চাই যে, ভ্রূণ থাকতেই যারা মা-বাবার পক্ষপাতের রোষানলে পিষ্ট তারা যে পৃথিবীর বুকে একটু বেশি পিষ্ট হবে এটাই স্বাভাবিক। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া যোগ্যতা থাকলেও মেয়েরা সহজে কোনো চেয়ারের অধিকারী হতে পারে না, সে হোক দেশ আর বিদেশ। আমেরিকার মতো স্থানে এখনো তাদের নিয়ে বৈষম্য, লন্ডনের মতো শহরে এখনো নারী-পুরুষের বেতন বৈষম্য হয়। দেশে তো প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সত্যি বলতে বেতন-ভাতা এসবের সুনির্দিষ্ট কোনো এসওপি (SOP) নেই।

নিজেও এমন সমস্যার সম্মুখীনও যে হইনি তা নয়, কাজের লেভেল যতই উচ্চ স্কেলে হোক না কেন, বেতন বাড়ে পুরুষ কর্মীর বেশি। মেয়েরা যতই এগিয়ে যাক না কেন সফলতার সিঁড়ি যেন ওদের জন্য সবখানেই একটু বাঁকা। জন্মের আগেই পক্ষপাতমূলক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে, তাই সর্বত্রই টিকে থাকার জন্য তাদের যুদ্ধ করতে হয়, তবে একদিন নিশ্চয় সুদিন আসবে এ যুদ্ধের জয় হবে।








Leave a reply