ধীরে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী

|

গত বছরের তুলনায় চলতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকটাই কম। ডেঙ্গু মৌসুম নিয়ে শুরুর দিকে আতঙ্ক ছিল। তবে বর্তমানে ডেঙ্গুর প্রকোপ ও আতঙ্ক নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সাধারণত একসঙ্গে দুটি ভাইরাসের সংক্রমণ হয় না। দেশে যেহেতু করোনার সংক্রমণ ব্যাপক আকারে ছড়িয়েছে। তাই ডেঙ্গুর সংক্রমণ খুব বেশি হয়নি। তবে আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই মাসে ২৩ জন ডেঙ্গু রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়। আগস্ট মাসে তা তিন গুণ বেড়ে হয় ৬৭ জন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা সংক্রমণের ভয়ে যান চলাচল সীমিত এবং অনেক হাসপাতাল রোগী গ্রহণ না করায় এতদিন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েও অনেকে পরীক্ষা করাতে পারেনি। আগস্ট থেকে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হওয়ায় ডেঙ্গু পরীক্ষা বেড়েছে, ফলে বাড়ছে রোগীও। তাছাড়া এখন ডেঙ্গুর ভর মৌসুম। গত কয়েক দিনের থেমে থেমে বৃষ্টি ও রোদ এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল। এই কারণেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপ অনুযায়ী, এডিস মশার প্রজনন এবার অনেক কম। গত বছর যেখানে আটটি মশার উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল এ বছর সেখানে পাওয়া গেছে দুটি। অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গত আট মাসে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় জানুয়ারি মাসে। ওই মাসে রোগীর সংখ্যা ছিল ১৯৯ জন। ফেব্রুয়ারি মাসে ৫৪ জন, মার্চ মাসে ২৭ জন, এপ্রিল মাসে ২৫ জন, মে মাসে ১০ জন, জুন মাসে ২০ জন, জুলাই মাসে ২৩ জন, আগস্ট মাসে ৬৬ জন এবং সেপ্টেম্বর মাসের তিন দিনে ৫ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। সেই হিসাবে চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৪২১ জন। এদের মধ্যে ৮ জন এখনো বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। গত বছর মোট ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। আগস্ট মাস পর্যন্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৭১ হাজার ৯৭ জন।

শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল লতিফ ভোরের কাগজকে বলেন, থেমে থেমে বৃষ্টি মশার প্রজননে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। বাংলাদেশের মতো গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোতে এ রোগের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রধান কাজ হলো মশার উৎস নির্মূল করা। চলতি বছর এডিস মশা নিয়ে কোনো গবেষণা করিনি। তবে বছরের শুরুতেই আমরা দেখেছি সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য বিভাগ এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে বেশ তৎপর ছিল। এ কারণেই হয়তো মশা ও রোগী দুই-ই কম।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার জাতীয় ম্যালেরিয়া ও এডিসবাহিত রোগ নির্মূল কর্মসূচির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. আফসানা আলমগীর খান ভোরের কাগজকে বলেন, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অনেক কম। আগস্টে রোগী বাড়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, করোনার কারণে অনেকেই হাসপাতালে গিয়ে নমুনা পরীক্ষা করাননি। হাসপাতালে চিকিৎসাও নেননি। আগস্টে এই ভয় কাটিয়ে মানুষ ডেঙ্গুর পরীক্ষা করানোর পাশাপাশি হাসপাতালেও ভর্তি হয়েছে। এ কারণেই রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে।

কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং স্বাস্থ্য তথ্য ইউনিটের (এমআইএস) ডেপুটি চিফ (মেডিকেল) ডা. এ বি মো. শামছুজ্জামান ভোরের কাগজকে বলেন, ডেঙ্গু এখন ‘ওয়ান টাইম ইস্যু’ নয়। বছরজুড়েই ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যায়। তবে এখন ডেঙ্গুর ‘পিক টাইম’ চলছে। এছাড়া থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। যা মশা বিস্তারের জন্য অনুকূল। এসব কারণেই রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টির পরপরই এডিস মশার ডিম ফুটে লার্ভা বের হয়। লার্ভা ১০ দিনের জীবনচক্র শেষ করবে। এক্ষেত্রে বৃষ্টির পর একই জায়গায় ১০ দিন পানি জমাট থাকলে সেখান থেকে এডিস মশার জন্ম হবে, যদি সেখানে আগে থেকে এডিস মশার ডিম থাকে। একটি স্ত্রী মশা কমপক্ষে ১০০টি ডিম দিতে পারে। ডিমগুলো যে কোনো পরিবেশে বেঁচে থাকার ক্ষমতা রাখে এবং আট মাসেরও বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারে; এমনকি কঠিন শীতেও বেঁচে থাকে এডিস মশার ডিম।








Leave a reply