তারুণ্যের বিজয়ের প্রতীক :সাবাস বাংলাদেশ

|

সুকান্ত ভট্টাচার্য তার আঠারো বছর বয়স কবিতায় লিখেছেন, ‘এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে’। হ্যাঁ, ঠিকই। এদেশের বুকে আঠারো নেমে এসেছিল। 

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সেই ভয়াল রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অতর্কিত হামালার প্রতিবাদে এ দেশের তরুণ যুবারা ঝাঁপিয়ে পড়ে পাক হানাদার বাহিনীর উপর। জীবন বাজি রেখে তারা দেশকে রক্ষার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যান। রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চালিয়েছেন ’৭১ এর ১৬ ডিসেম্বরের সেই মহান বিজয়ের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। তারা সফল, তারা অমর। ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে তাদের ওই আত্মত্যাগ।

তারুণ্যের এই দুঃসাহসের ইতিহাসকে চির অম্লান করে রাখতে ১৯৯২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে তোলা হয় স্বাধীনতার স্মারক ভাস্কর্য ‘সাবাস বাংলাদেশ’। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তাজউদ্দীন আহমেদ সিনেট ভবন চত্বরে শিল্পী নিতুন কুণ্ডের হাতে নির্মিত হয় এই ভাস্কর্যটি। এর উদ্বোধন করেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।

মূল ভাস্কর্যে দেখা যায়, ৪০ বর্গফুট একটি বেদির ওপর খালি গায়ে দুর্বার গতিতে ছুটে চলেছে দুই তরুণ। তাদের একজনের দুইহাতে একটি রাইফেল। আরেকজনের এক হাতে রাইফেল আর এক হাত মাথার সামান্য উপরে মুষ্টিবদ্ধ, যা দৃঢ়প্রতিজ্ঞার প্রতীক। তারা সাধারণ গ্রামীণ তরুণদের প্রতীক, যারা দেশকে স্বাধীন করার জন্য প্রাণপণে লড়ে গেছেন শত্রুদের সঙ্গে। 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েরও অনেক শিক্ষার্থী এই মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। মূলত ছাত্র যোদ্ধাদেরই প্রতীক এই ভাস্কর্যটির তরুণদ্বয়।

এই তরুণদের ঠিক পেছনেই রয়েছে ৩৬ ফুট লম্বা একটা দেয়াল। দেয়ালটির অগ্রভাগে রয়েছে একটি বৃত্ত, যা স্বাধীনতার সূর্যের প্রতীক। ভাস্কর্যটির দুইপাশে রয়েছে ৫×৬ বর্গফুট আয়তনের দুটি আয়তাকার দেয়াল। যার একটি দেয়ালে রয়েছে একজন বাউল তরুণ আর একজন বাউল তরুণী, যা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের প্রমাণ। 

অপর দেয়ালটিতে খোদাই করা আছে মায়ের কোলে শিশু ও দুজন তরুণী, যাদের একজনের হাতে রয়েছে আমাদের জাতীয় পতাকা। আর সেই পতাকার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অল্প বয়সের এক কিশোর বালক।

আর ভাস্কর্যটির সামনে জ্বল জ্বল করছে কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই অমর দুটি পঙক্তি,
“সাবাস বাংলাদেশ
এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়,
জ্বলে পুড়ে ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়।’’

কবি যথার্থই বলেছিলেন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর থেকে ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬২’র ছাত্র আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা, ৬৯’র গণঅভ্যূত্থান এবং সবশেষ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত যতগুলো সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছে তার সবগুলোতেই এদেশের তরুণরা প্রমাণ করে দিয়েছেন যে এ জাতি কখনো মাথা নোয়াবার নয়।








Leave a reply