জাহাজের খালাসি হয়ে বাঙালির আমেরিকা যাত্রা,সুন্দর একটি ইতিহাস জেনে নিন

|

বাঙালির আমেরিকা যাত্রা এখন কোনো ঘটনাই নয়, কিন্তু আজ থেকে দেড় শ বছর আগে পূর্ব বাংলা থেকে যে গুটিকয় বাঙালি মার্কিন মুলুকে এসেছিলেন, বিস্তর লড়াই করতে হয়েছিল তাঁদের। সেই অজানা গল্প।

আমেরিকা। সে এক স্বপ্নের দেশ। এখন আমেরিকায় পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের বাঙালির সংখ্যা অজস্র। তবে ঠিক কবে থেকে ভাগ্যান্বেষণে মার্কিন মুলুকে পাড়ি জমাতে শুরু করল এ দেশের মানুষ? সেই ইতিহাস জানতে আমাদের যেতে হবে আজ থেকে প্রায় দেড় শ বছর আছে। তবে এ লেখার শুরুতে এ কথাও বলে নেওয়া দরকার যে সেই শুরুর দিকে পূর্ব বাংলার যেসব বাঙালি আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন, নিদারুণ কষ্ট আর লড়াই-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে সেখানে তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন নিজেদের দাঁড়ানোর পাটাতন।

যুক্তরাষ্ট্রের সেনসাস ব্যুরোতে রাখা নথিপত্রে উল্লেখ রয়েছে, ১৭৮৫ সালের শুরুর দিকে তৎকালীন পূর্ব বাংলার কিছু লোক আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিল। তারা মূলত ছিল শিপ জাম্পার। জাহাজ থেকে লুকিয়ে এবং ইমিগ্রেশনের চোখকে এড়িয়ে গোপনে যারা ভিনদেশের মাটিতে আশ্রয় নেয়, তাদেরকেই বলা হয় শিপ জাম্পার।

ভারত তখন ইংল্যান্ডের অধীনে। সেই সময়ে ব্রিটিশদের কড়া নজর এড়িয়ে মোট বারোজন বাঙালি আমেরিকায় এসেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে ওই বারোজন বাঙালির ভাগ্যে কী জুটেছিল, সে সম্পর্কে বিশদভাবে জানার কোনো সুযোগ ঘটেনি। তবে এতটুকু জানা গেছে, বেনিয়ামিন ফ্রাঙ্কলিন নামে এক আমেরিকান ব্যবসায়ী বারোজন বাঙালি নাবিককে পেনসিলভানিয়ার নিউ হ্যাভেন পোর্ট থেকে উদ্ধার করে পেনসিলভানিয়ার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন।

এখানে প্রশ্ন আসতে পারে, সে সময় জাহাজের খালাসি হয়ে আমেরিকায় যাওয়ার পথটা কী ছিল? উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে জাহাজের যেকোনো ধরনের একটা খালাসির কাজ নিয়ে আমেরিকা বা বিলেতের বন্দরে গোপনে গা ঢাকা দেওয়ার অভিনব কৌশলটি পূর্ব বাংলাসহ উপমহাদেশের স্বপ্নবাজ কিছু মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। তত দিনে বাঙালি জেনে গিয়েছিল, কীভাবে জাহাজ থেকে পালিয়ে খুব সহজেই ভিনদেশের মাটি স্পর্শ করা যায়। পূর্ব বাংলা থেকে আসা বাঙালিদের কাছে যে রুটটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পায়, তা হলো কলকাতা বা হুগলি বন্দর থেকে কোনো ব্রিটিশ বা ইউরোপিয়ান জাহাজে চড়ে প্রথমে লন্ডন, তারপর লিভারপুল এবং লিভারপুল থেকে নিউইয়র্ক বা বাল্টিমোর যাওয়া। নিউইয়র্কের ম্যানহাটানের (হারলেম, লোয়ার ইস্ট সাইড), ব্রুকলিন, ব্রঙ্কস, স্টেটান আইল্যান্ড, এলিস আইল্যান্ড অথবা ডেট্রয়েটের প্যারাডাইস ভেলি, বোটম অথবা ওয়েস্ট বাল্টিমোরের পেনসেলভানিয়া অ্যাভিনিউ—এই এলাকাগুলো তত দিনে বাঙালিদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে।

জাহাজের শ্রমিক হিসেবে কাজে যোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালি খালাসিদের প্রচণ্ড রকম শারীরিক কাজ করতে হতো। জানা যায়, এই ব্রিটিশ জাহাজগুলোতে সপ্তাহে আশি ঘণ্টার মতো করে তাঁদের কাজ করতে হতো। এই হাড়ভাঙা পরিশ্রমের বিনিময়ে তাঁরা যে পারিশ্রমিক পেতেন, তাতে ভবিষ্যৎ সঞ্চয় তো দূরের কথা, দেশে ফেলে আসা দরিদ্র সংসারেও কিছু পাঠাতে পারতেন না। তবে যেহেতু তাঁদের সবার মূল লক্ষ্য ছিল আমেরিকা বা বিলেত, তাই অবলীলায় এই কঠিন পরিশ্রমকে হাসিমুখেই মেনে নিতেন। তাঁদের স্বপ্ন ছিল আমেরিকায় পৌঁছে কোনোরকম একটা কাজ জোগাড় করে জীবনটাকে গুছিয়ে নেওয়া। তবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল বৈধ কাগজপত্র ও ইমিগ্রেশনের কঠোর আইন। সে কারণে বেশির ভাগই স্থানীয় কোনো আমেরিকান (আফ্রিকান আমেরিকান বা পুয়ের্তোরিকান) নারীকে চুক্তিতে বিয়ে করে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে থাকার জন্য বৈধ কাগজপত্র বানাতেন। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো ভিনদেশের মাটিতে কীভাবে এক বাঙালি আরেক বাঙালির পাশে এসে দাঁড়াবেন, সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন, বৈধ কাগজপত্র করার কৌশলটি শিখিয়ে দেবেন অথবা যেকোনোভাবেই হোক, কারও বৈধভাবে থাকার কোনো গতি করে দেবেন—এসব বিষয়ে তাঁদের সবার মধ্যেই এক অসাধারণ অলিখিত ঐক্য ছিল। নিউইয়র্ক বলুন, বাল্টিমোর বলুন বা নিউ অরলিয়েন্স—বাঙালিরা যাতে চোখ বুজে কারও বাড়িতে উঠতে পারেন, কাজ জোটা না পর্যন্ত দুবেলা খাবার খেতে পারেন এবং কাজ চালানোর জন্য বাড়ির ঠিকানাটা ব্যবহার করতে পারেন, সে জন্য আগেভাগেই করে রাখা হতো সব রকম ব্যবস্থা।

১৮৯০ থেকে ১৯১০—এই কুড়ি বছর আমেরিকায় পূর্ব বাংলা থেকে আসা বাঙালি শিপ জাম্পারদের তৎপরতা রাতারাতি বেশ বেড়ে গিয়েছিল। এতটা বেড়েছিল যে তৎকালীন সময়ে পূর্ব বাংলার শ্রমজীবী মানুষের চোখে বিশেষত সিলেট, চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ, নোয়াখালী থেকে জাহাজের খালাসি পদ অর্থাৎ লস্করের একটি পদ বাগিয়ে আমেরিকায় দেশান্তরিত হওয়া নতুন কোনো ঘটনা ছিল না। সেই সময়ে ঘাট-সারেং পদটিকেও এই ভবিষ্যৎ জাহাজিরা খুব শ্রদ্ধার সঙ্গেই দেখতেন। কারণ, জাহাজি হতে হলে ঘাট-সারেংদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকা ছিল জরুরি। তাঁদের খুশি করতে পারলেই লন্ডন বা নিউইয়র্কের কোনো জাহাজের খালাসির চাকরি জোগাড় করা সহজ হতো। বিষয়টা এমন যে একবার জাহাজ যদি লন্ডন বা নিউইয়র্কে নোঙর করতে পারে, তাহলেই সব সমস্যার সমাধান। তারপর সেই জাহাজ থেকে গা ঢাকা দিয়ে গোপনে লুকিয়ে অজানা আমেরিকার কোনো উপকূলে নেমে পড়া যাবে।১৮৯০ থেকে ১৯১০—এই কুড়ি বছর আমেরিকায় পূর্ব বাংলা থেকে আসা বাঙালি শিপ জাম্পারদের তৎপরতা রাতারাতি বেশ বেড়ে গিয়েছিল। এতটা বেড়েছিল যে তৎকালীন সময়ে পূর্ব বাংলার শ্রমজীবী মানুষের চোখে বিশেষত সিলেট, চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ, নোয়াখালী থেকে জাহাজের খালাসি পদ অর্থাৎ লস্করের একটি পদ বাগিয়ে আমেরিকায় দেশান্তরিত হওয়া নতুন কোনো ঘটনা ছিল না।

এই প্রসঙ্গে রম্যলেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্প ‘নোনাজল’-এর কিছু অংশ তুলে ধরা যেতে পারে। কারণ, এই গল্পে একজন বাঙালির জাহাজের খালাসি হয়ে কীভাবে আমেরিকায় থিতু হয়েছিলেন, সেই ইতিহাসের অসাধারণ চিত্রায়ণ রয়েছে:

‘আমাকে সাহায্য করতে হলো শুধু একটা পেতলের ডেগচি যোগাড় করে দিয়ে। সন্ধ্যার অন্ধকারে সমীরুদ্দী সাঁতারের জাঙিয়া পরে নামল জাহাজের উলটো ধার দিয়ে, খোলা সমুদ্রের দিকে। ডেগচির ভেতরে তার সু, জুতো, মোজা আর একখানা তোয়ালে। বুক দিয়ে সেই ডেগচি ঠেলে ঠেলে বেশ খানিকটা চক্কর দিয়ে সে প্রায় আধ-মাইল দূরে গিয়ে উঠবে ডাঙায়। পাড়ে উঠে, তোয়ালে দিয়ে গা মুছে, জাঙিয়া ডেগচি জলে ডুবিয়ে দিয়ে শিস দিতে দিতে চলে যাবে শহরের ভেতর। সেখানে আমাদেরই এক সিলেটি ভাইকে সে খবর দিয়ে রেখেছিল হামবুর থেকে। পুলিশের খোঁজাখুঁজি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে গা-ঢাকা দিয়ে থাকবে কয়েকদিন, তারপর দাড়িগোঁফ কামিয়ে চলে যাবে নুউক থেকে বুগুরে, যেখানে সিলেটিরা কাঁচা পয়সা কামায়। পালিয়ে ডাঙায় উঠতে পুলিশের হাতে ধরা পড়ার যে কোনো ভয় ছিল না তা নয়, কিন্তু একবার সুটটি পরে রাস্তায় নামতে পারলে পুলিশ দেখলেও ভাববে, সে নুউকবাসিন্দা, সমুদ্রপারে এসেছিল হাওয়া খেতে।’

এবার কীভাবে একজন জাহাজের খালাসি বন্দর থেকে পালাতেন, সেই বিষয়টি জানা যাক। জাহাজ বন্দরে ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গে দলবদ্ধ বা এককভাবে জাহাজ থেকে কারা কীভাবে পালাবে এবং কোন পথে কে কোথায় যাবে, সেটি আগে থেকে নির্ধারণ করা সম্ভব ছিল না। তবে যতটুকু সম্ভব নিজেদের বুদ্ধি খাটিয়ে এবং অন্য কোনো শিপ জাম্পারের পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এই সাহসী স্বপ্নচারী খালাসিরা তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে নিজেদের সাধ্যমতো তৈরি রাখতেন। জাহাজ বন্দরে ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজের সব কর্মচারীকে ‘ইমিগ্রেশন সোর পাস’ দেওয়া হতো। সেই পাসের কল্যাণে জাহাজের কর্মচারীরা বন্দরে শুধু নির্দিষ্ট একটি এলাকায় আইনগতভাবে থাকার অনুমতি পেতেন। জাহাজ ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার তাঁদের বন্দর ত্যাগ করা ছিল বাধ্যতামূলক। একজন খালাসি ঠিক এমন মোক্ষম সময়ের অপেক্ষায় থাকতেন। সোর পাস নিয়ে ইমিগ্রেশন পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে গা ঢাকা দেওয়াই ছিল তখন তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় কাজ। জাহাজের খালাসিরা পালানোর জন্য নিউইয়র্কের এলিস আইল্যান্ড, নিউ জার্সির আটলান্টিক সিটি, এলিজাবেথ, আসবারি পার্ক, লং বিচ—এসব নিরাপদ স্থানকে সবচেয়ে ভালো আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিতেন, ইতিহাস এমনই সাক্ষ্য দেয়।

নিউইয়র্কের হারলেম, লোয়ার ইস্ট সাইড (ইস্ট ভিলেজ), ব্রুকলিনের ব্রুকলিন হাইটস—এই শহরগুলোও পলাতক জাহাজের খালাসিদের কাছে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আবার আরেকটা দল ছিল, যারা এলিস আইল্যান্ডে আসত বটে, কিন্তু তাদের গন্তব্য ছিল দক্ষিণে অথবা দক্ষিণ-পশ্চিম অন্য কোনো অঙ্গরাজ্যের দিকে। এ ক্ষেত্রে তারা যেত নিউ অরলিয়েন্স, মিশিগানসহ বিভিন্ন শহরে।

এঁদের মধ্যে বেশির ভাগই জাহাজ থেকে পালিয়ে সাউদার্ন রেইলওয়ে ফাস্ট মেইল বা সাউথ ওয়েস্টার্ন ভেস্টিবুলড লিমিটেড ট্রেনে চড়ে ওয়াশিংটন ডিসিসহ বিভিন্ন শহরে নিজেদের বসত গড়তেন। এখানে একটা বিষয় বলা দরকার যে এই শিপ জাম্পারদের আপাতস্বপ্ন আমেরিকায় বসত গড়া হলেও তাঁরা তাঁদের নিজ দেশ থেকে যতটুকু সম্ভব বিভিন্ন রকম জিনিসপত্র যেমন রেশম, মসলিন বা মনিহারি তৈজসপত্র, মসলাপাতি সঙ্গে করে নিয়ে আসতেন। উদ্দেশ্য একটাই—এসব বিক্রি করে কিছু উপার্জন করা। আর বসন্ত আসার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁরা বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে আসা মনিহারি দ্রব্যাদি আমেরিকা বা লন্ডনের মাটিতে বিক্রি করতেন।

১৯০০ থেকে ১৯১০ সালের আমেরিকার আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, শুধু নিউ অরলিয়েন্স শহরেই পূর্ব বাংলা থেকে আসা জাহাজ পলাতকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে গিয়েছিল। ‘১৯০০ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত নিউ অরলিয়েন্সে পূর্ব বাংলা থেকে আসা সেই সময়ে বাঙালির সংখ্যা ছিল ৫০ জন। এই ৫০ বাঙালি শহরের বিভিন্ন এলাকায় কমপক্ষে ৮টি বাড়ি ভাড়া করে সবাই সেখানে গাদাগাদি করে থাকতেন।’

আজ থেকে প্রায় দেড় শ বছর আগে এভাবেই কিছু স্বপ্নচারী পূর্ব বাংলা বাংলাদেশের বাঙালি জাহাজের খালাসি হয়ে কঠিন জীবনযুদ্ধের মুখোমুখি হয়ে দেশান্তরি হয়েছিলেন, বসতও গড়েছিলেন আমেরিকায়। তাঁদের রেখে যাওয়া পদচিহ্ন অনুসরণ করে মার্কিন মুলুকে পরে ধীরে ধীরে আমরা আমাদের অস্তিত্বের ইতিহাস নির্মাণ করেছি।

সূত্র:  বিবেক বল্ডের ‘বেঙ্গলি হারলেম অ্যান্ড দ্য লস্ট হিস্টোরিস অব সাউথ এশিয়ান আমেরিকা’ ও লেখক প্রণীত ‘শিপ জাম্পার: বাঙালির আমেরিকা যাত্রা’।








Leave a reply