জনপ্রিয় হওয়ার উপায়: উদ্যোক্তা হিসেবে জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগান

|

জনপ্রিয় হওয়ার উপায় দেখে ভাববেন না আমরা সস্তা জনপ্রিয়তার কথা বলছি, যা আজকাল ফেসবুক বা ইউটিউবে একটু ভাঁড়ামি করলেই পাওয়া যায়। আজ আমরা যেরকম জনপ্রিয় হওয়ার উপায় নিয়ে কথা বলব, তা আপনাকে নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে অনেকটাই এগিয়ে দেবে। বিশেষ ভাবে আমরা আজ অনলাইনে জনপ্রিয় হওয়ার কৌশল নিয়ে আলোচনা করব।সঠিক জনপ্রিয়তা মানে প্রয়োজনীয় জায়গায় গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া। আপনার কাস্টোমার, ইনভেস্টর, ক্লায়েন্ট – সবার কাছেই আপনার গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যাবে, এবং আপনি উদ্যোক্তা হিসেবে দ্রুত উন্নতি করতে পারবেন।

খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে, জনপ্রিয়তা বা গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হলে এমন কিছু করতে হবে, যা কোনও না কোনও ভাবে মানুষের কাজে লাগে, এবং তারা তা ইতিবাচক ভাবে গ্রহণ করে। মানুষের মাঝে জনপ্রিয় ও পরিচিত হওয়া খুব একটা কঠিন নয় – কিন্তু এটার জন্য ধৈর্য ধরে কাজ করতে হয়।এই লেখায় আমরা কিছু পরামর্শ দিচ্ছি যেগুলো আপনাকে অল্প সময়ে একটি সত্যিকার সুনাম তৈরী করতে সাহায্য করবে।

পরামর্শগুলো দিয়েছেন আমেরিকান মার্কেটিং ফার্ম “অটোমিকা ক্রিয়েটিভ গ্রুপ” এর জাপানী সহ প্রতিষ্ঠাতা তাতসুয়া নাকাগাওয়া। অটোমিকা গ্রুপের প্রধান কাজই হল নতুন ব্যবসাকে মার্কেটে জনপ্রিয় করানোর পাশাপাশি মার্কেটে থাকা প্রোডাক্ট ও সার্ভিসের জনপ্রিয়তা বাড়ানো। – অর্থাৎ, জনপ্রিয়তা বাড়ানোর বিষয়ে তিনি প্রফেশনাল।চলুন তাহলে প্রফেশনালের কাছ থেকে জনপ্রিয় হওয়ার উপায় জেনে নেয়া যাক।

০১. গুগলের মত সার্চ ইঞ্জিনগুলোতে নিজেকে নিয়ে আসুন:যত দিন যাচ্ছে, সার্চ ইঞ্জিনের প্রতি মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে। কেনাকাটা থেকে শুরু করে যে কোনও কৌতুহল মেটানোর জন্য মানুষ গুগলে সার্চ করছে। আপনিও চাইলে সার্চ ইঞ্জিনকে কাজে লাগাতে পারেন।

ওপরের ছবিতে একটি গুগল সার্চ এর স্যাম্পল দেখা যাচ্ছে। আপনি যে ক্ষেত্রে কাজ করেন, সেই ক্ষেত্র নিয়ে মানুষ সার্চ ইঞ্জিনে কি খুঁজছে – তা বের করার জন্য আপনার কাজের সাথে সম্পর্কিত কিছু শব্দ সার্চ বক্সে লিখুন। আপনি লেখা শেষ করার আগেই গুগল বেশ কিছু সার্চ সাজেশন দেখাবে। মানুষ যেসব বিষয় বেশি খোঁজে – সেগুলোই এই সাজেশনে চলে আসে, এগুলোকে কী-ওয়ার্ড বলে। আপনি চাইলে শব্দ যোগ – বিয়োগ করে নতুন সাজেশন বের করার চেষ্টা করতে পারেন। হয়তো ‘best restaurants in bangladesh’ – এর পর ‘a’ লিখে দেখলেন কি কি সাজেশন আসে। তারপর আবার ‘b’ লিখলেন – তখন অন্য সাজেশন দেখাবে। এগুলোর থেকে একটি টপিক বেছে নিয়ে একটি ভালো মানের লেখা লিখে ফেলুন। নিজে না পারলে অন্য কাউকে দিয়ে লেখান। তারপর নিজের ব্লগ বা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করুন। ওয়েবসাইট বানানোর ক্ষেত্রে নিজে না পারলে ভালো কোনও ওয়েব ডেভলপারের সাহায্য নিন। প্রয়োজনে পরিচিত কোনও এসইও বা সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন এক্সপার্ট এর সাহায্য নিন। সম্ভব হলে কিছু টাকা দিয়ে কাউকে হায়ার করুন।

সেই লেখায় আপনার প্রতিষ্ঠান ও নিজের বিষয় গুরুত্বের সাথে রাখুন। এতে করে সেই বিষয়ে যারা আসলেই আগ্রহী, তাদের কাছে আপনার ও আপনার প্রতিষ্ঠানের নাম পরিচিত হয়ে উঠবে।সার্চ ইঞ্জিনে যাতে আপনাকে ও আপনার প্রতিষ্ঠানকে খুঁজে পাওয়া যায় – গুগলে “how to do seo” লিখে সার্চ করলে এই বিষয়ে খুব সহজেই অনেক কিছু জানতে পারবেন। অন্য দেশের মত বাংলাদেশেও গুগল সার্চ এর মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এটাকে কাজে লাগান।

০২. সোশ্যাল প্রোফাইলে কার্যকর ভাবে এ্যাকটিভ থাকুনঃফেসবুকে মাঝে মাঝে কয়েকটি সেল্ফি, রেস্টুরেন্টে খাওয়ার ছবি, বেড়াতে যাবার ছবি – ইত্যাদি দিলে আপনিও অন্য সবার মত রেসপন্স পাবেন। কিন্তু উদ্যোক্তা হিসেবে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য আপনাকে আরও কার্যকর ভাবে এ্যাকটিভ হতে হবে।আপনার ব্যবসার সাথে সম্পর্কিত গ্রুপ ও পেজে এ্যাকটিভ থাকুন। সেখানে কেউ প্রশ্ন করলে কাজে লাগার মত উত্তর দেয়ার চেষ্টা করুন। সমস্যার সমাধান নিয়ে সুন্দর করে স্টাটাস দিন, কাজের ক্ষেত্রের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিজের মতামত দিন এবং নিজের ব্যবসার বিভিন্ন ইভেন্ট নিয়ে ছবি ও স্টাটাস পোস্ট করুন – যেগুলো আপনার ব্যবসার ভাবমূর্তি ভালো করবে।

এছাড়া আপনার ব্যবসার যাঁরা আইডল, মানে যেসব সফল উদ্যোক্তা গণকে আপনি গুরু মানেন – তাঁদের জীবনী ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে স্ট্যাটাস বা গ্রুপ ও পেজে ভালো কিছু লিখুন – যেগুলো আপনার নিজের ক্ষেত্রের মানুষ শেয়ার করতে চাইবে। এগুলো আপনার নাম ও প্রোফাইলকে ছড়িয়ে দেবে। লিখতে না পারলে ভিডিও ব্লগও করতে পারেন।

নিজের ছবি বা অনুভূতি প্রকাশ করার বদলে যদি এমন কিছু পোস্ট করেন – যেগুলো আসলেই মানুষের কাজে লাগে – তাহলে দেখবেন আপনার কাজের ক্ষেত্রের মানুষ ও অন্যদের মাঝে আপনার সত্যিকার জনপ্রিয়তা সৃষ্টি হয়েছে।এছাড়া, ফেসবুকের বাইরে লিংকড ইন এবং গুগল প্লাস এ এ্যাকটিভ হোন। বিশেষ করে লিংকড ইন প্রফেশনালদের জন্য আদর্শ জায়গা। এখানে আপনি আপনার ব্যবসায়িক জ্ঞান ও মতামত প্রকাশ করলে তা আপনাকে অনেক বেশি জনপ্রিয় করে তুলবে।তবে একটি কথা বলে রাখা ভালো, সোশ্যাল মিডিয়াতে এ্যাকটিভ থাকলেও খেয়াল রাখবেন – এটা যেন আপনার কাজের সময় নষ্ট না করে। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় এর পেছনে দিন। হতে পারে তা এক বা দুই ঘন্টা। কিন্তু এর বেশি নয়। প্রতিদিন দু’টি পোস্ট এবং কিছু সময় কমেন্টের জবাব দেয়াই যথেষ্ঠ।

০৩. ব্যবসা সম্পর্কিত পত্রিকা, বা পত্রিকার ব্যবসা–বানিজ্য পাতায় লেখা/সাক্ষাৎকার ছাপানঃ ব্যবসার জগতে নিজের গ্রহণযোগ্যতা, পরিচিতি এবং জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য এটা খুবই কার্যকর। সম্ভব হলে শীর্ষস্থানীয় অথবা মধ্যম সারির ব্যবসা বিষয়ক পত্রিকা বা সাধারণ পত্রিকার ব্যবসা-বানিজ্য পাতায় নিজের একটি লেখা বা সাক্ষাৎকার ছাপানোর ব্যবস্থা করুন। তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে, বা আপনার ব্যবসার ক্ষেত্রে একজন উঠতি এক্সপার্ট হিসেবে লিখুন, অথবা সাক্ষাৎকার দিন।

আপনার নিজের পরিচিত সাংবাদিক না থাকলেও, আপনার কোনও বন্ধু বা পরিচিতের বন্ধু বা পরিচিত কেউ নিশ্চই সংবাদ পত্রের সাথে জড়িত থাকবেন। – এদের কারও সাহায্য নিয়ে পত্রিকায় লেখা বা সাক্ষাৎকার ছাপানোর ব্যবস্থা করুন এবং সেটা প্রচারের ব্যবস্থা করুন। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের প্রোফাইলে সাংবাদ পত্র এবং (যদি সাক্ষাৎকার হয়) সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকে ধন্যবাদ দিয়ে শেয়ার করুন।আজকাল সব পত্রিকারই পেপার ও অনলাইন সংস্করণ থাকে। চেষ্টা করবেন দুই সংস্করণেই নিজের প্রচারণার কাজটি করতে।

০৪. ফ্রি–তে কার্যকর তথ্য ও শিক্ষা দিনঃআপনি যদি একজন উদ্যোক্তা হয়ে থাকেন, তবে অবশ্যই আপনার কোনও না কোনও বিষয়ে খুব ভালো দক্ষতা থাকবে। হতে পারে সেটা মার্কেটিং, পন্য বা সেবা সৃ্ষ্টি। আপনি হয়তো খুব ভালো বার্গার বানাতে পারেন, অথবা খুব ভালো ব্র্যান্ডিং জানেন। – যেটাই হোক, নিজের এই দক্ষতা অন্যদের বিনা মূল্যে শিক্ষা দিন।আপনার দক্ষতার বিষয়ের বিভিন্ন দিক ও সমস্যার সমাধান নিয়ে ছোট ছোট ওয়েব পোস্ট, অথবা সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট বানান – যেগুলো মানুষের কাজে লাগবে। এইসব কনটেন্ট বানানোর সময়ে যত পারেন আপনি কোথা থেকে শিখেছেন – সেই সোর্সগুলো বলবেন। হয়তো আপনি একটা কিছু কোনও বই থেকে শিখেছেন – সেই বিষয়টি নিয়ে কথা বলার সময়ে সেই বইয়ের নাম বলুন।এতে করে, আপনি যে বানিয়ে বানিয়ে কথা বলছেন না – সেটা প্রমাণ হবে – এবং মানুষের কাছে আপনার গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। আর মানুষ যখন আপনার এইসব কার্যকর টিপস এবং পরামর্শ শেয়ার করবে – তখন আপনার ফলোয়ারের সংখ্যা বাড়তে থাকবে – এবং আপনি ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠবেন।

এর সবচেয়ে ভালো দিকটি হল, আপনি শুধু চেহারা দেখিয়ে বা ভাঁড়ামি করে ফলোয়ার বাড়াচ্ছেন না – আপনার পোস্ট বা কনটেন্টগুলো আসলেই মানুষের কাজে লাগবে – এবং জনপ্রিয় হওয়ার পাশাপাশি আপনি সম্মান পাবেন। যার প্রভাব দুই দিন পর হারিয়ে যাওয়ার বদলে আরও বাড়তে থাকবে।

পরবর্তীতে যখন আপনি নিজেই একটি ছোট কমিউনিটিতে হলেও পাবলিক ফিগারে পরিনত হবেন, তখন নিজের অভিজ্ঞতা থেকে নিজেই মানুষকে পরামর্শ দিতে পারবেন – যেগুলো মানুষ রেফারেন্স ছাড়াই গ্রহণ করবে। কারণ সেগুলো হবে আপনার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া সত্যিকা কার্যকর উপদেশ।এছাড়া আপনার ব্যবসার ক্ষেত্র সম্পর্কিত ওয়েবসাইট বা অনলাইন ফোরামে বিভিন্ন মানুষের প্রশ্নেরও উত্তর দিন, এবং কৌশলে নিজের পরিচয় তুলে ধরুন।এভাবে আপনার নিজের বিজনেস কমিউনিটিতে তো বটেই, সাধারণ মানুষের মাঝেও আপনার ও আপনার প্রতিষ্ঠানের একটি ভালো পরিচিতি গড়ে উঠবে। এবং আপনার বা আপনার প্রতিষ্ঠানের নাম শোনা মাত্র তাদের মাঝে একটি পজিটিভ চিন্তা সৃষ্টি হবে – যা উদ্যোক্তা হিসেবে আপনাকে অনেকটাই এগিয়ে দেবে।

০৫. নতুনদের সাহায্য করুনঃআপনি যদি আপনার কাজের ক্ষেত্রে আজ নেমে থাকেন, তবে আগামীকাল যে নামবে – সে আপনার জুনিয়র। এবং আপনি তারচেয়ে একদিন এগিয়ে আছেন। এখন যদি তার কোনও সাহায্যের দরকার হয় – তবে সাধ্যমত চেষ্টা করুন তার সমস্যার সমাধান করতে। নতুনদের মাঝে ছড়িয়ে দিন যে, আপনি তাদের সাধ্যমত সাহায্য করতে প্রস্তুত আছেন। এতে করে নতুনদের মাঝে আপনি জনপ্রিয় হয়ে উঠবেন, এবং মার্কেটে আপনার প্রভাব বাড়বে। ভুলেও ভাববেন না যে, অন্যদের সাহায্য করলে তারা আপনাকে ছাড়িয়ে যাবে। এটা খুবই পুরনো ধারণা, এবং এতে আপনার জনপ্রিয়তার সাথে সাথে আপনার বিজনেস কমিউনিটিতে গ্রহণযোগ্যতাও কমে যাবে।নতুনদের সাহায্য করলে দেখবেন, তারাই মার্কেটে আপনার সুনাম বাড়িয়ে দিচ্ছে, সেইসাথে আপনাকে তাদের সাধ্যমত সাহায্যও করবে।

০৬. নিজের ব্যবসার লোগোকে যত পারুন, প্রচার করুনঃআপনি হয়তো খেয়াল করে দেখবেন, খেলার মাঠে বা সিনেমার পর্দায় এমন কিছু কোম্পানীর লোগো দেখা যায়, যেগুলোর সাথে সত্যিকার অর্থে খেলার বা সিনেমার কোনও সম্পর্ক নেই। যেমন ধরুন, ক্রিকেট মাঠে সিমেন্ট কোম্পানীর বিলবোর্ড বা সিনেমা শুরুর আগে পর্দায় মেলামাইন কোম্পানীর লোগো।এর কারণ হল, লোগো এবং ব্র্যান্ডকে পরিচিত করানো। মানুষকে দেখতে অভ্যস্ত করানো। জনপ্রিয় হওয়ার প্রথম শর্তই হল পরিচিতি। খেলা দেখতে গিয়ে সিমেন্ট কোম্পানীর লোগো দেখা লোকটি যখন কোনও কারণে সিমেন্ট কিনতে যাবে, তখন সে অন্য সিমেন্টের বদলে সেই সিমেন্টটিকেই প্রাধান্য দেবে। বার বার একটি জিনিস দেখতে থাকলে তার ওপর আমরা নিজের অজান্তেই বিশ্বাস করতে শুরু করি। এটা মানুষের জন্মগত স্বভাব। এবং মার্কেটাররা এটিকে খুব ভালোভাবে কাজে লাগান। – আপনি নিজেও এটি কাজে লাগাতে পারেন।

নিজের কোম্পানীর নাম ও লোগো দিয়ে পোস্টার ও স্টিকার ছাপিয়ে বিভিন্ন জায়গায় লাগাতে থাকুন। এতে মানুষের কাছে আপনার কোম্পানীর নাম ও লোগো পরিচিত হতে থাকবে। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল, ওয়েবসাইট, ব্যবসায়িক কাগজপত্র – সবখানে আপনার লোগোটিকে রাখার চেষ্টা করুন। আগে যেসব পরামর্শ দেয়া হয়েছে যেমন, ব্লগ পোস্ট, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট – ইত্যাদিতেও নিজের লোগোর ব্যবহার করুন।

এভাবে লোগো প্রচার করলে মানুষ নিজের অজান্তেই আপনার প্রতিষ্ঠানকে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য করে তুলবে।








Leave a reply