এবার আলুতে অশনি সংকেত

|

মোটা চালের ভাত আর আলু ভর্তা- নিম্নআয়ের মানুষের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। কয়েক মাস ধরেই সব ধরনের মোটা চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী। পেঁয়াজ, সবজির দর ক্রমে চড়তে থাকলেও আলুর দামটা ছিল মোটামুটি স্থিতিশীল। কিন্তু গত এক সপ্তাহে কেজিপ্রতি আলুর দাম বেড়েছে ১০-১৫ টাকা। রাজধানীর বাজারে এখন ৫০ টাকার নিচে মিলছে না এক কেজি আলু। ফলে শুধু নিম্নআয় কেন, মাঝারি আয়ের মানুষের কপালেও ফুটে উঠছে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। সর্বশেষ কবে আলুর বাজারে এমন ‘আগুন’ লেগেছিল তাও স্মরণ করতে পারছেন না অনেকেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এক মাস আগেও রাজধানীর বাজারে প্রতিকেজি আলু বিক্রি হয়েছে ২৫-৩০ টাকা। আর গতকাল প্রতিকেজি আলু বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকা। অর্থাৎ মাসের ব্যবধানে আলুর দাম বেড়ে দিগুণ হয়েছে। আর কোল্ড স্টোরেজগুলোতে ১ হাজার ৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া আলুর বস্তা এখন ১ হাজার ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছরের এই সময়ে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হয়েছিল প্রতি কেজি ২০ থেকে ২৫ টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যানুসারে, গত দুদিনে আলুর দাম কেজিপ্রতি বেড়েছে প্রায় ৫-৭ টাকা। গতকাল রবিবার রাজধানীর বাজারে মানভেদে প্রতিকেজি আলু বিক্রি হয়েছে ৪০-৫০ টাকা। এর আগে গত বৃহস্পতিবার প্রতি কেজি আলু বিক্রি হয়েছে ৩৮ থেকে ৪৫ টাকা। এর আগের সপ্তাহে প্রতি কেজি আলু মান ভেদে বিক্রি হয়েছিল ৩৪ থেকে ৪০ টাকা। সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি আলুর দাম বেড়ে ১০ টাকাও বেশি। আর রাজধানীর মুদি দোকানে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা পর্যন্ত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কনজুমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, বাজারে এক অলিখিত সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। কোনো পণ্যের সামান্য সংকট তৈরি হলে এর সুযোগ নিতে থাকে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে সবজির দাম বাড়ায় অনেকে আলুর প্রতি ঝুঁকেছেন। এই কারণেও আলুর চাহিদা বেড়েছে। কিছু অসাধু অতি মুনাফালোভী এর সুযোগ নিতে আলুর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতি বছর আলুর বাম্পার ফলন হওয়ায় মৌসুমে অনেক কমে যায় আলুর দাম। এবার অতিবৃষ্টির কারণে কৃষক সময়মতো আলুবীজ রোপণ করতে না পারায় এখনো বাজারে আসেনি আগাম জাতের আলু। এই কারণে বাজারে আলুর সংকট তৈরি হয়েছে। ডিসেম্বরের আগে নতুন আলু বাজারে আসার সম্ভাবনা খুবই কম। এছাড়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বন্যার কারণে অনেক কৃষকই আলু বপন করতে পারেনি। এ অবস্থায় আগামীতে আলু না পাওয়ার শঙ্কা থেকে অনেক কৃষক আলু কিনে রাখছেন। এছাড়া ভারতে আলুর চাষে সংকট তৈরি হওয়াতে, সেখানেও আলুর দাম বেশি। যার কারণে ভারত থেকে আলু আমদানিতে আগ্রহ নেই কারো। তবে এই সংকটে কিছু অসাধু ফরিয়াও সুযোগ নিচ্ছেন। যার কারণে বাজারে আলুর সংকট তৈরি হয়েছে। আগামীতে আলুর দাম আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

এসব বিষয় নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ এসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মোশারফ হোসেনের সঙ্গে। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, বৃষ্টির কারণে কৃষক সময়মতো আলুর বীজ রোপণ করতে পারেননি। এ কারণে আগামী ডিসেম্বরের আগে নতুন আলু পাওয়া প্রায় অসম্ভব। যেহতু বাজারে আগাম আলু আসছে না, তাই অনেক কৃষক আলু স্টক করছেন। তারা বিক্রি করতে চাইছেন না। এছাড়া আলুর দাম যাতে না বাড়ে এ জন্য কোল্ড স্টোরেজ এসোসিয়শনের পক্ষ থেকে সব কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের চিঠি দিয়েছি আমরা। যাতে কেউ আলুর স্টক না করেন। আমরা চাই ভোক্তা যেন সঠিক দামে আলু কিনতে পারেন।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে বছরে আলুর চাহিদা প্রায় ৮৫ লাখ টন। গত কয়েক বছর ধরে আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। এই সময়ে দেশে আলুর উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৭ হাজার টন। গত দুবছর অধিক উৎপাদন হওয়ায় দেশ থেকে আলু রপ্তানিরও সুযোগ হয়েছিল। কিন্তু এবার দেশে আলু উৎপাদন হয়েছে ৮৫ লাখ টন। অর্থাৎ চাহিদা আর উৎপাদন সমান সমান। কিন্তু তোলা ও সংরক্ষণ পর্যায়ে কিছু আলু নষ্ট হয়ে যায়, যা এখন ঘাটতিতে রূপ নিয়েছে।

কোল্ড স্টোরেজ এসোসিয়শনের তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রায় ৩৫০-৪০০ কোল্ড স্টোরেজ রয়েছে। কোল্ড স্টোরেজগুলোতে গত মৌসুমে আলুর মজুত ছিল ৫৫ লাখ টন। এবার মজুত হয়েছে ৪০ লাখ টন। সে হিসাবে গত বছরের চেয়ে ১৫ লাখ টন ঘাটতি রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন কনসাস কনজুমার্স সোসাইটির (সিসিএস) নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদ ভোরের কাগজকে বলেন, আলু দেশীয় পণ্য। এমন তো নয়, আলু আমদানি হয়, আমদানি খরচ বেড়েছে, বেশি দামে বিক্রি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন সরকারের পক্ষ থেকে আলুর সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ ও বাজারের কঠোর নজরদারি।








Leave a reply