এই শহরে নির্ভেজাল জীবনানন্দ কোথায়?

|

শিশির ভেজা সবুজ ঘাস, নদী, পুকুর, ক্রিকেট আর ফুটবল খেলার মাঠ, কিংবা টাকার অভাবে পড়তে না পারা স্কুলজীবনের সেই সহপাঠীর প্রিয়মুখ ফিরে দেখার আনন্দ কোথায় পাওয়া যাবে এই শহরে।

ভাবতে পারেন নদীমাতৃক এই দেশে একটা প্রজন্ম সাঁতার কাটতে জানবে না? জানবে কিভাবে, শহরমুখী হতে হতে গ্রামীণ জীবনটা যেন ক্রমশ আমাদের জীবন থেকে নেই হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ ভাগ্যের সন্ধানে যেমন শহরে পাড়ি জমায়, তেমনি আবার উৎসবে আনন্দে গ্রামে যায়। বিশেষ করে দুই ঈদে মানুষের প্রিয়জনের সান্নিধ্যে যাওয়ার সেকি প্রাণান্তকর চেষ্টা। মওকা বুঝে বাস মালিকদের ভাড়া বৃদ্ধি, রেলের টিকেটের জন্য রাতভর অপেক্ষা, সড়ক-মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট ইত্যাকার কষ্টকর নানা সমস্যা উজিয়ে ঘরে ফেরার আনন্দই হয়ে ওঠে মুখ্য। কেন? করোনাকালে একটা কথা উঠেছিল, চাকরি হারিয়ে ঢাকা থেকে গ্রামে ফিরে যাচ্ছে প্রায় ৫০ হাজার পরিবার। অনেকে এই গ্রামে ফিরে যাওয়াকে ব্যাথিত মনে দেখলেও কেউ এর ইতিবাচক দিকও বলেছেন। একটা শহরে আর চাপ না বাড়িয়ে যদি নিজ গ্রামে কর্মসংস্থানের যোগান করতে পারে তো খারাপ কি? ডিজিটাল সরকার ব্যবস্থায় এখন গ্রামেও হয়েছে ব্যাপক উন্নয়ণ। স্কুল কলেজ মাদরাসা কোন কিছুরই কমতি নেই। শহরের সঙ্গে নির্বিঘ্নে করা যায় যোগাযোগ, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় বিদেশটাও আছে হাতের মুঠোয়। শুধু গ্রামে থাকতে চাইতে হবে। এর জন্য চাই সঠিক প্ল্যানিং।

নাগরিক সুযোগ-সুবিধার অনেকখানিই পাওয়া যায় এখন গ্রামে বসেই। বিদ্যুৎ পৌঁছেছে বেশির ভাগ গ্রামেই। সে জন্য বাড়ি বাড়ি টেলিভিশন। এমনকি ডিশ লাইন থাকায় মুম্বাই-কলকাতা ঢাকার চেয়েও কাছের। সবার হাতে হাতে মোবাইল ফোন। কম্পিউটার, সঙ্গে ওয়ারলেস ইন্টারনেট সংযোগ। মৎস্য চাষী, পোল্ট্রি ফার্মের মালিক, কিংবা সবজি চাষি মোবাইলে জেনে নেন কেমন বাজার যাচ্ছে ঢাকায়। এভাবে ভার্চুয়াল একটা যোগাযোগ তো আছেই গ্রামের সঙ্গে শহরের। শহরের সঙ্গে গ্রামের। কিন্তু তাতেও তো সব হয় না। দুধের স্বাদ কি ঘোলে মেটে?

যারা গ্রাম থেকে শহরে আসে তাদের প্রাণটা আসলে পড়ে থাকে গ্রামেই। বিশেষ করে যারা গ্রামে বড় হয়েছেন। এই নাগরিক জীবন হয়তো অনেক কিছু দেয়। শিক্ষা-দীক্ষা, ভাত-কাপড়, রুটি রোজগারের নিশ্চয়তা। অনেক উত্তেজনা। ভোগ বিলাস আনন্দ। কিন্তু জীবনের সব পাওয়া, সব তৃষ্ণা কি মেটে তাতে? কিছুই কি বাকি থাকে না?

এই শহরে তো দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ নেই, জোয়ার ভাটায় দোলে ওঠা নদী নেই, বৃক্ষের শ্যামল ছায়া নেই, ধানের ক্ষেতে রোদ ও ছায়ার লুকোচুরি খেলা নেই, ঘাসের ডগায় শিশির নেই, রাখালের বাশের বাঁশি নেই, গোধূলির আলো নেই, বাউকুড়ানির ডগায় ঝরাপাতার নৃত্য নেই, পাখির কলকাকলি নেই, পিঠেপুলি পাটিসাপটার আয়োজন নেই, আউল, বাউল জারি সারি, ভাটিয়ালির হৃদয় উদাস করা সুর নেই, বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ নেই, নেই এক চিলতে উঠোন। এসব নেই- এর পাল্লাটা এতটাই ভারী যে, তা লিখে শেষ করার নয়।

এই শহরে নির্ভেজাল জীবনান্দ কোথায়? এখানে যেন মানুষ নয়, শোষক আর শোষিত, আমলা আর কামলা (মজুর), মালিক-শ্রমিক, পুঁজিপতি আর নিঃস্ব, হাইরাইজ বিল্ডিং বনাম রেললাইনের পাশের বস্তির বিস্তর ব্যবধান। জীবন কোথায় এখানে? চারিদিকে ঠগ, প্রবঞ্চক, প্রতারক, অজ্ঞানপার্টি, মলমপার্টি। কী নির্মম, কী পাশবিক এই জীবনধারা। যানজট আর জনজটে রাস্তায় চলাই দায়। ঘুষখোর কর্মকর্তা ইলিশ কেনে ১০/১৫ হাজার টাকা হালি, আর সাধারণের পুঁটি কিনতেই নাভিশ্বাস। তবু আমরা এই শহরেই থাকি, এই শহরেই বাঁচি। প্রশ্ন ওঠে মনে, কোনদিনই কি আর ফিরে যাওয়া হবে না সেই গ্রামে?








Leave a reply