ইসলামে ধর্মান্তর যাত্রায় তাবিথার প্রচেষ্টা এবং সফল হওয়ার গল্প

|

আমি কিভাবে ইসলামের পথে এসেছি? এটি আসলে একটি কৌশলী প্রশ্ন।

তখন আমার বয়স ছিল ১৫ এবং একজন ইংরেজ মেয়ে হিসেবে আমি আমার টিনেজ জীবন উপভোগ করছিলাম। আমি যা বলতে পারি তা হচ্ছে সে সময় আমি যে পথে চলেছিলাম তা আমাকে যেকোনো দিকে নিয়ে যেতে পারতো কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা আমাকে সঠিক পথের দিশা দিয়েছেন।

একটি বিষয় আমি নিশ্চিত ভাবে জেনেছি আর তা হচ্ছে আপনি কোথা থেকে এসেছেন তা কোনো ব্যাপার নয় আল্লাহ তায়ালা যদি আপনাকে চান তবে তিনি আপনাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।

আরাধনা করার স্থানে সফর করা

একজন তরুণী হিসেবে আমি প্রায় সময় লোকজন দের সাথে ধর্মের অসারতা এবং পরকালীন জীবন সম্পর্কে তর্কে লিপ্ত হতাম।

আমি চিন্তা করতাম যে ইহকালের জীবনই একমাত্র জীবন এবং আমাকে এর কৃতকর্মের জন্য কারো নিকট জবাবদিহি করতে হবে না। আমি নিজেকে মুক্ত মনে করতাম কিন্তু এখন আমি দেখতে পারছি যে, সেসময় আমি দুনিয়ার জীবনের চাকচিক্য দ্বারা আকৃষ্ট ছিলাম।

আরাধনা করার স্থান সমূহে গমন সম্পর্কে আমি এবং আমার আরেকজন বন্ধু মিলে প্রায়সময় মজা করতাম। আমরা এর পূর্বে চার্চে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমরা কখনো মসজিদ বা সিনাগগে যাই নি। আর এজন্যই আমরা এসব স্থান সমূহে সফর করার সিদ্ধান্ত নিলাম।

আমার বিদ্যালয়ে অনেক বৈচিত্র্য ছিল কিন্তু এর পরেও আমি কখনো এশিয়ান শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনা করিনি।

তথাপি সেদিন স্বাস্থ্য এবং সামাজিক ক্লাসের শেষে এশিয়ান মেয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নিলাম এটা দেখতে যে তাদের মধ্যে মুসলিম কেউ আছে কিনা।

যখন আমি তাদের নিকটে গেলাম তখন তারা আমাকে জানালো যে, আমার ধারণা সঠিক। সুতরাং আমি তাদের কাছে জানতে চাইলাম তারা আমাকে এবং আমার বন্ধুকে মসজিদে নিয়ে যেতে পারবে কিনা। তারা আনন্দের সাথেই আমার অনুরোধে সায় দিল।

নবী ইব্রাহীম এবং নবী মুহাম্মদ(সা.)

আর এর পরের স্বাস্থ্য এবং সামাজিক ক্লাসে সেদিনকার একজন মেয়ে আমার জন্য কিছু ইসলামের বিশ্বাস সম্পর্কিত বই নিয়ে আসলো। সেখানে ছিলো নবী মুহাম্মদ(সা.) এর জীবনী এবং নবী ইব্রাহীম(আ.) এর জীবনী।

অনিচ্ছা স্বত্বে ও আমি সেগুলো গ্রহণ করে নিলাম এবং চিন্তা করতে লাগলাম, ‘এ পৃথিবীতে এগুলো আবার কি? এইসমস্ত বই কেন সে আমাকে দিচ্ছে?’

কিন্তু মসজিদে সফর করার বিষয়টি স্থগিত হয়ে গেল। তথাপি একদিন আমি বই গুলো খুলে দেখি। আমি নবী ইব্রাহীম(আ.) এর জীবনী সম্পর্কিত বইটি পড়তে শুরু করি। আমি বইটি পড়ে এতটাই মগ্ন হয়ে গেলাম যে, কখন এটি শেষ হয়ে গেলা তা আমি বুঝে উঠতে পারিনি।

আর পরবর্তী বইটি ছিল নবী মুহাম্মদ(সা.) বিদায় হজের ভাষণ সম্পর্কিত। আমি বইটি পড়ে অবাক হয়ে যাই এই ভেবে যে, ইসলাম মানব জাতির মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং নবী মুহাম্মদ(সা.) বাণী সমূহ আমার হৃদয়ে গভীর দাগ কেটে দিয়েছে।

এভাবে আমি যখন ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে কিছুটা জানতে শুরু করি তখন আমি আমার নতুন বন্ধুদের মসজিদ সফরের কথা স্মরণ করিয়ে দিই। আর এক ছুটির দিনে আমরা মসজিদে যাই।

আমরা যে মসজিদটিতে যাই সেটি আসলে ছিল শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য তৈরী একটি মসজিদ। কিন্তু আমার বন্ধুদের সহায়তায় আমরা ইমামের সাথে দেখা করি এবং একই সাথে আমার জন্য সেখানে কিছু আরবি ভাষার পাঠের ব্যবস্থা করা হয়।

আর পরবর্তী একমাস যাবত আমি আরবি ভাষা শিক্ষার পাঠে অংশ নিই এবং ইসলাম সম্পর্কে আমার জ্ঞান আরো বৃদ্ধি করি। ধীরে ধীরে আমি ইসলামের প্রেমে পড়ে যাই।

মসজিদে যাওয়া আসার সাথে সাথে আমি কিছু ইসলামিক সার্কেল তৈরী করি বিশেষ আমি স্থানীয় দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক সোসাইটির সাথে যোগাযোগ করা শুরু করি।

এ বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে অনেক সময় ইসলামিক আলোচনা অনুষ্ঠান হত এবং প্রতি বছরের শেষে তারা ‘Islam Awareness Week’ নামের আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতো আর আমি এখানে থেকে অনেক কিছু শিখেছি।

আমি পূর্বেই বলেছি যে, সেসময় আমার বয়স ছিল ১৫ এবং আমি এসব বিষয় নিয়ে খুবই দ্বিধা গ্রস্ত ছিলাম। আমি ইসলাম ধর্মকে ভালবেসেছিলাম এবং একই সাথে এ বিষয়টি নিয়ে ভীতির মধ্যে ছিলাম।

বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের একটি ইসলামিক আলোচনা অনুষ্ঠানে আমি একজন বোনের সাথে পরিচিত হই যিনি আমাকে জানিয়েছিলেন যে, আমার শহরে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত অনেকেই বসবাস করেন এবং এখানে একটি স্থানীয় সংস্থা রয়েছে যারা নও মুসলিমদের বিভিন্ন ভাবে সহায়তা করে থাকে।

আর এ সংবাদ শুনে আমি খুবই চমৎকৃত হই কারণ এখানে আমি একেবারে একা নই!

ওই বোন আমাকে সংস্থাটির ফোন নম্বর দেন এবং আমি তাদের সাথে যোগাযোগ করলে তারা আমাকে তাদের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়।

আমি সেই অনুষ্ঠানে যোগ দান করি এবং তারা আমাকে উষ্ণ ভাবে স্বাগত জানায়। সেখানে আমি একটি দারুণ শব্দ সম্পর্কে জানতে পারি আর তা হচ্ছে ‘মাশা আল্লাহ’ একই সাথে আমি সেখানে সালাত আদায় করার নিয়মাবলী জানতে পারি।

একটি অস্বাভাবিক স্বপ্ন সত্যি হল

ইসলাম সম্পর্কে আমার জানার আগ্রহ খুব দ্রুত এগোতে থাকে এবং আমার ঠিক কি করনীয় তা সম্পর্কে আমি সেসময় আসলে নিশ্চিত ছিলাম না।

এক রাতে আমি একটি অস্বাভাবিক স্বপ্ন দেখি। সেসময় আমার কাছে এ স্বপ্নটির অতোটা গুরুত্ব ছিলনা কিন্তু পরবর্তীতে আমি সেই স্বপ্নটিই আমাকে আল্লাহর ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে সহায়তা করে।

স্বপ্নে আমি দেখতে পাই যে, আমি আমার বিদ্যালয়ের একজন মুসলিম বন্ধুর সাথে একটি টেবিলে বসে আছি। প্রেক্ষাপটে খুব সুন্দর করে কেউ একজন গেয়ে চলছিলো।

আমি স্বপ্নের ওই সুন্দর আওয়াজের কিছুই বুঝতে পারিনি এবং রমজান মাসের শেষে ঈদের দিনে আমি আমার এক মুসলিম বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে যাই। তাদের বাসার টিভি তে তখন একটি ইসলামি টিভি চ্যানেল চলছিল এবং সেখানে আজানের ধ্বনি প্রচারিত হচ্ছিল।

আমি আমার বন্ধুটিকে জিজ্ঞেস করি, ‘এটি কি?’

সে উত্তরে জানালো, ‘এটি হচ্ছে সালাতের জন্য আহ্বান।’

আমি তখন বলতে থাকি সুবহান আল্লাহ, ঠিক এই শব্দটি আমি আমার স্বপ্নে শুনতে পেয়েছিলাম। আল্লাহ আমাকে তার সুন্দর ধর্মের দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। আর এর পরেই আমি আমার বন্ধুকে জানালাম যে, আমি মুসলিম হওয়ার জন্য তৈরী।

আমি যেদিন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার জন্য শাহাদা নিয়েছিলাম সেদিন আমি আমার পরিকল্পনা সম্পর্কে আমার মাকে জানবো বলে চিন্তা করেছিলাম।

আমি আমার মাকে জানাই যে, ‘মা, আমি আজ মুসলিম হয়ে গিয়েছি। আপনি কি আমার সাথে আসবেন?’

আমার মা এমন ভাবে তাকালেন যেন আমি মজা করছি। কিন্তু তিনি আমার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন নি এবং আমি মসজিদের দিকে চলে যাই।

আমার শাহাদা

আমি সেখানে একাকী ছিলাম না কারণ মসজিদে গিয়ে আমি দেখতে পাই আমার অনেক নতুন বন্ধু সেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। পরে মসজিদের ইমামের সাথে আলোচনার পর আমার শাহাদা পাঠের অনুষ্ঠান শুরু হয়।

কিন্তু যখন মসজিদের ইমাম আমাকে জানালেন যে, মাইক্রোফোনে শাহাদা ঘোষণা দিতে হবে তখন আমি কিছুটা ভয় পেয়ে যাই। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা আমাকে সাহায্য করেছিলেন।

শাহাদা পাঠের পরে আমি উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাই। আমার নিকট মনে হয়েছিল কয়েক মিলিয়ন মানুষ আমাকে জড়িয়ে ধরেছে এবং আমাকে স্বাগত জানাচ্ছে। কয়েক জন বোন আমার শাহাদা পাঠ উদযাপন করার জন্য খুব সুস্বাদু খাবার নিয়ে এসেছিলেন।

আলহামদুলিল্লাহ, ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পরে আমি আমার পরিবারের নিকট থেকে কোনো ধরণের বাধার সম্মুখীন হই নি। কারণ সেসময় আমি এতোটাই তরুণ ছিলাম যে তারা ভেবেছিল আমার ধর্মান্তরে কিছু যায় আসে না এবং তারা আমাকে এ বিষয়ে কিছু বলার জন্য আসলেই অনেক দেরি করে ফেলেছিলেন।

একমাত্র যে বিষয়টি নিয়ে আমি বিব্রত হয়েছিলাম তা হচ্ছে যখন আমি হিজাব পরিধান করতাম আমার মা তখন আমাকে এড়িয়ে চলতেন।

আল্লাহ অতিশয় দয়ালু এবং তিনি আমাদের দুর্বলতা সমূহের খবর রাখেন সুতরাং আমরা যদি চেষ্টা চালিয়ে যাই তবে আমরা কখনো ব্যর্থ হবো না।

শেষে আরেকটি কথা আমি বলতে চাই, শুরুতে আমি যে বন্ধুটির সাথে আমার মসজিদ সফরের কথা ছিল সে পরবর্তীতে আমার সাথে মসজিদে যায় নি কিন্তু পরে সে আল্লাহর রহমতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল।

নিশ্চিত ভাবেই মিথ্যা থেকে সত্য অতিশয় পরিষ্কার!








Leave a reply