ঔষধি গাছ ও এর খুঁটিনাটি সম্পর্কে জেনে নিন

|

WHO (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংগঠন) দ্বারা প্রণয়ন করা হয়েছে যে, যেসব গাছের এক বা একাধিক অংশ প্রাণীর ক্ষেত্রে দরকারি ঔষধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়, তাকে Medicinal plant বা ঔষধি গাছ বলে। গাছ যদি হয় বিভিন্ন রোগের ঔষধ, তখন তাকে ছোটখাট হাসপাতাল বলাই যায়। কিন্তু সঠিক ব্যবহার না জানলে এই ঔষধ রোগের উপশমের বদলে বিষে রূপান্তরিত হবে।

এসব ঔষধি গাছের সাথে অন্যান্য গাছের তেমন কোনো তফাৎ নেই, তবুও এসব গাছে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে, যা তাদের অন্য সব গাছ থেকে আলাদা করে তুলেছে। এটা এখন প্রতিষ্ঠিত যে, উদ্ভিদের প্রাকৃতিক সংশ্লেষণের সাথে কিছু সেকেন্ডারি পদার্থ যেমন উপক্ষার, গ্লাইকোসাইড, ট্যানিনস, উদ্বায়ী তেল, খনিজ এবং ভিটামিনের সংমিশ্রণে ঔষধি বৈশিষ্ট্য ধারণ করে।

ঔষধি গাছ একটি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক সেবাদানে এই ঔষধি গাছ যুগ যুগ ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা ঐতিহ্যগত এবং বর্তমানের আধুনিক চিকিৎসায় ঔষধি গাছ দেশে এবং বিদেশে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ক্যান্সার, কিডনি, হৃদরোগ, লিভারের মতো আরো নানা রোগের জন্য ঔষধ তৈরি হচ্ছে উদ্ভিদ থেকে।
এই ঔষধি গাছ অন্যান্য দেশে রপ্তানি করেও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। কেননা, ঔষধি গাছের চাহিদা দেশ-বিদেশে ব্যাপক হারে বাড়ছে।

HYPTIS SUAVEOLENS: প্রচলিত নাম তোকমা, গণজা তুলসী হলেও ‘বিলাতী তুলসী’ হিসাবেই সকলের কাছে পরিচিত। সারা বছরই এই উদ্ভিদ পাওয়া যায়। গাছ মাঝারি আকারের গুল্মজাতীয়। লম্বায় বেশি বড় হয় না। ৩ থেকে ৫ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ২ থেকে ৪ সেন্টিমিটার প্রশস্ত পাতায় রয়েছে ঝাঁঝালো গন্ধ। ডাল কিঞ্চিত লোমশ। নিম্নস্থল ঘন লোমযুক্ত। ফুল খুবই ছোট। ফুলের সাথে ছোট ছোট কালো রংয়ের বীজ উৎপন্ন হয়।
এই উদ্ভিদটির পাতা, ফুল, শেকড়সহ সবই ব্যবহার করা যায়।
ফার্মাকোলজিক্যাল অ্যাকশন- উদ্দীপক, পাকস্থলীর বায়ুনাশক।

উদ্ভিদ বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়- সুগন্ধি তৈরিতে এবং পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত চামড়া রোগ, নানারকম স্কিন সমস্যা, পুরাতন সর্দি কাশিতে এর ব্যবহার হয়ে আসছে। এর পাতার রস অ্যান্টিসপাসমোডিক এবং অ্যান্টিরহোম্যাটিক, এ রস ব্যবহার করা হয় ক্যান্সার এবং টিউমার রোগে।

ABROMA AUGUSTA: প্রচলিত নাম শয়তানের তুলা (Devil’s Cotton) হলেও স্থানীয় নাম ‘উলটকম্বল’। বসন্তের শেষ থেকে ফুল ফুটতে শুরু করে। ঝোপে, জঙ্গলে, রাস্তার পাশে দেখা যায় এদের। এরা ১০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। পাতাগুলো ৪ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে এবং পাতায় ৩ থেকে ৫টি স্প্ল্যাশযুক্ত প্যাটারিট শিরা থাকে। পাতায় এবং ডালপালায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শক্ত লোম থাকে। গাঢ় লাল রংয়ের ফুল ফোটে।

এই উদ্ভিদের পাতা,মূল,ডালপালা ব্যবহার করা যায়।ফার্মাকোলজিক্যাল অ্যাকশন- ডাই ইউরেটিক, তঞ্চন প্রতিরোধক, জরায়ু সংক্রান্ত ঔষধ।
পাতা এবং ডালপালা গর্ভাশয়ের সমস্যা, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, রজঃস্রাব জনিত সমস্যা, দুর্বলতা, জ্বলন পেশী, গনোরিয়াতে সমস্যা দূর করতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

BASELLA ALBA: প্রচলিত নাম ভারতীয় শাক। স্থানীয় নাম পুঁইশাক। সারা দেশে শাক হিসাবে এটি একটি নিয়মিত খাবার। এর পাতা নরম, মসৃণ, চকচকে, মোমীয়। ছোট ছোট বৃত্তাকার ফল হয়ে থাকে।এটি লতানো প্রকৃতির। আকারে ১০ মি. লম্বা হয়ে থাকে। লতাগুলো কিঞ্চিত মোটা, নরম। এর পাতাগুলো হৃদয়াকৃতির।এই উদ্ভিদের পাতা শাক হিসাবে খাওয়া হয়। লতানো ডালও খাওয়ার উপযোগী। এমনকি এর ফলও অনেকে রান্না করে খেয়ে থাকেন।ফার্মাকোলজিক্যাল অ্যাকশন- ডাই ইউরেটিক, ত্বক মসৃণকারক।এই উদ্ভিদের পাতার রস কব্জির ব্যথা উপশম করতে ব্যবহৃত হয়। ফুসকুড়ি, কানের সমস্যা, নাকের সমস্যা, গনোরিয়া, আলসার অন্ত্রের সমস্যা সহ আরো নানা সমস্যায় এটা ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

CELOSIA ARGENTEA: প্রচলিত নাম মোরগের ঝুড়ি, কয়লা ঘাস। স্থানীয় নাম মোরগফুল। গুল্মজাতীয় এই উদ্ভিদ খুব একটা লম্বা হয় না। ৩ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে আর ১ ফুট পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে। যেখানে সরাসরি সূর্যের আলো পড়ে, সেসব জায়গায় এই উদ্ভিদ ভালো জন্মায়। এর ফুল বিভিন্ন রংয়ের হয়ে থাকে- লাল, গোলাপি, হলুদ, সাদা রংয়ের ফুল ফোটে। ফুলগুলো দেখলে মনে হয় স্তরে স্তরে সাজানো। ফুলগুলো মোলায়েম।এই উদ্ভিদের পাতা, শিকড়, ডালপালা, ফুলসহ সব অংশই ব্যবহারযোগ্য।ফার্মাকোলজিক্যাল অ্যাকশন- প্রদাহ রোধকারী।ডায়রিয়া, রক্তের সমস্যা, মুখের ঘা, চোখের সমস্যাসহ আরো নানা রোগে এই উদ্ভিদ ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ALOE INDICA: ‘অ্যালোভেরা’ নাম হলেও স্থানীয় নাম ঘৃতকুমারী। বর্তমানে অ্যালোভেরা পাতা নামেই বেশি পরিচিত এবং জনপ্রিয়। আগে এই উদ্ভিদ বনে জঙ্গলে বেড়ে উঠলেও বর্তমানে এর উপকারিতার কথা জেনে অনেকেই বাসায় টবে লাগাচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবেও এই উদ্ভিদ এখন চাস হচ্ছে। পাতাগুলো বড়, পুরু ও মাংসল। পাতার প্রান্ত তীক্ষ্ণ। পাতার ভেতর থাকা আঠালো শাঁস উপকারী। পাতার রং উজ্জ্বল গাঢ় সবুজ।এই উদ্ভিদের পাতা, শেকড় সহ সব অংশই ব্যবহার করা যায়। ফার্মাকোলজিক্যাল অ্যাকশন- বিশোধক, পরজীবী বিনাশকারী।

পাতার রস বা শাঁস অনেক রোগের টনিকের মত কাজ করে। তবে সরাসরি এই রস ব্যবহার করলে তাতে উপকারের বদলে ক্ষতি হবে। গাছ থেকে পাতা কেটে কিছুক্ষণ আলাদা রাখতে হবে। তাতে পাতা থেকে একটা রস আপনা আপনি আলাদা হয়ে যাবে, যেটির রং হবে হলুদ। এই হলুদ রসটা আলাদা করে তারপর পাতার উপরের অংশ ছুরি দিয়ে কেটে কাঁটা চামচ দিয়ে ভেতরের শাঁসটা বের করে নিলেই হবে। এই শাঁস বিভিন্ন রোগের ঔষধ। কাশি, দুর্বলতা, ডিস্পেনিও, হাঁপানি, জন্ডিস সহ আরো নানা রোগে ব্যবহার হয়। ব্রণের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে অ্যালোভেরার জেল মহৌষধের কাজ করে।সকালবেলা খালি পেটে এক গ্লাস অ্যালোভেরার রস খেলে পেটের যেকোনো রোগ থেকে মুক্তি মেলে।

SARACA ASOCA DE WILDE: স্থানীয় নাম অশোক। এটা মাঝারি আকারের উদ্ভিদ। কমলা, কমলা হলুদ রংয়ের ফুল হয়। পাতাগুলো গাঢ় সবুজ রংয়ের। ফুলগুলো গুচ্ছকারে হয়ে থাকে। পাতা শিরাবিন্যাস যুক্ত।এই উদ্ভিদের বাকল, পাতা, মূল ব্যবহারের উপযুক্ত।ফার্মাকোলজিক্যাল অ্যাকশন- টিউমার ও ক্যান্সার প্রতিরোধী।গর্ভাশয়ে প্রদাহজনিত, রক্তক্ষরণে, পাইলস, আলসার, ব্রণ, পেট ব্যথাসহ আরো নানা রোগে এই উদ্ভিদের বাকল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এর ফুল ফুসফুস, সিফিলিস, ডাইশেনারিতে ব্যবহার করা হয়।

WITHANIA SOMNIFERA DUNAL: প্রচলিত নাম শীতকালীন চেরি। স্থানীয় নাম অশ্বগন্ধা, ধুপ্পা। গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। খুব একটা লম্বা হয় না, ১৭০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। পাতা পুরু এবং গাঢ় সবুজ রংয়ের। পাতায় সাদাভাব আছে। ছোট ছোট ফুল হয়ে থাকে। এই উদ্ভিদের পাতা, শেকড় ব্যবহার করা যায়। ফার্মাকোলজিক্যাল অ্যাকশন- অ্যাডাপ্টোজেন, বেদনানাশক।ভারতীয়দের কাছে এটি পরিচিত ঔষধ। গর্ভাবস্থায় দুর্বলতা, সাধারণ দুর্বলতা, রিউম্যাটিজম, স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা এবং স্মৃতিশক্তি ও পেশীশক্তি বৃদ্ধিতে ব্যাপক ব্যবহৃত হয়ে থাকে এই উদ্ভিদ। এর পাতা এবং শেকড় মাথাব্যথা, উর্বরতা, কাশি, জন্ডিস, চরম দুর্বলতা, মুখের ঘা, ফুসকুড়িতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আলসারের জন্যেও এর পাতা এবং শেকড় ব্যবহার করা হয়ে থাকে।








Leave a reply