স্ট্রোক আক্রান্তের থ্রম্বোলাইটিক থেরাপি

|

করোনাকালীন এই সময়ে স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। একদিকে করোনার কারণে মানুষের নানা ধরনের টেনশন, আয় কমে যাওয়া, চাপ বিভিন্ন কারণে এর মাত্রা বেড়ে গেছে। স্ট্রোক এখন খুবই হঠাৎ হঠাৎ হচ্ছে প্রায় পরিবারে। বয়স্কদের পাশাপশি মধ্যবয়সীরাও স্ট্রোকের শিকার হচ্ছে। স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়া মানেই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ। রোগী একদিকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন আরেকদিকে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা করতে থাকেন আত্নীয়-স্বজনেরা।
সবচেয়ে পরিচিত স্ট্রোকের মধ্যে রয়েছে মস্তিষ্কের শিরায় রক্ত জমে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া। এতে মস্তিষ্কের ওই শিরার নিকটস্থ কোষগুলো দ্রুত মারা যেতে শুরু করে, তবে বর্তমানে এই রোগের কার্যকরী চিকিৎসা বাংলাদেশে রয়েছে। সম্প্রতি স্ট্রোকের জরুরি চিকিৎসা নিয়ে দ্য ইকোনমিস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন।
কোলেস্টেরল জমতে জমতে শুরু হয়ে যাচ্ছে (সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম) ধমনী, যার ফলে হচ্ছে স্ট্রোক। এরকম স্ট্রোককে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ইস্কিমিক স্ট্রোক’। স্ট্রোক সাধারণত ইস্কিমিক (রক্ত চলাচল বন্ধের কারণে স্ট্রোক) ও হেমোরেজিক (রক্ত ক্ষরণের কারণে স্ট্রোক) হলেও, বিশ্বে যত স্ট্রোকে আক্রান্ত হয় তার মধ্যে ৮৭% মানুষ ইস্কিমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে থাকে। নিউরোলজিস্টরা অ্যাটাক হওয়ার ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে এর চিকিৎসা শুরু করতে পারলে সফলতা পাওয়া যায়।
থ্রম্বোলাইটিক থেরাপি কী?
১। ইস্কিমিক স্ট্রোক ৪ থেকে ৫ ঘন্টার মধ্যে টিস্যু ‘প্লাসমিনোজেন অ্যাক্টিভেটর’ কার্ডিনেঙ, ক্লাটিনেঙ-জাতীয় ওষুধ শিরা বা অনেক ক্ষেত্রে ধমনীর মধ্যে দিতে হয়। এতে ব্রেনের রক্তনালীতে জমাকৃত রক্ত গলে গিয়ে রোগীর অবস্থা ভালো হতে সাহায্য করে। থ্রম্বাস বা জমাট রক্ত গলায় বলে এর নাম ‘থ্রম্বোলাইটিক থেরাপি’।
২। এ থেরাপিতে কাজ না হলে সরু ক্যাথিটারের সাহায্যে ওই জমাট রক্ত টেনে বার করে নেওয়া হয়, যাকে বলে ‘মেকানিকাল থ্রম্বেকটমি’। দু-এক ঘণ্টার মধ্যে এই চিকিৎসা শুরু করা গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেশ ভাল ফল পাওয়া যায়। এটি ৬ ঘণ্টার মধ্যে এলেও কাজ হবে। তারপর এলে আগের মতো ফল না হলেও চেষ্টা করা হয় যাতে ক্ষতির মাত্রা আর না বাড়ে।
৩। আসলে স্ট্রোক হলে এক সেকেন্ডে মস্কিষ্কের কয়েক হাজার স্নায়ু ও কোষের ক্ষতি হয়। এক মিনিটে নষ্ট হয় প্রায় বিশ লাখ কোষ। একবার নষ্ট হয়ে গেলে তাদের আর ঠিক করা যায় না। সমস্যা হচ্ছে মনে হলেই সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা শুরু করা উচিত। যদি ১০০ জন মানুষকে এই চিকিৎসার দরকার থাকে, তবে মাত্র ৫-৬ জনকে তা দেওয়া সম্ভব হয়। কারণ-
৪। স্ট্রোক হয়েছে তা বুঝতে না পারা, কোন চিকিৎসকের কাছে নেয়া হবে, কোথায় নিতে যাওয়া হবে, হাসপাতালের দূরত্ব ইত্যাদি মিলিয়ে রোগীকে যখন চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়, ততক্ষণে ‘উইন্ডো পিরিয়ড’ অর্থাৎ যতটুকু সময়ের মধ্যে এই চিকিৎসা দিলে কাজ হতে পারে তা শেষ হয়ে যায়। ফলে চিকিৎসায় আশানুরুপ ফল পাওয়া যায় না।
-দ্বিতীয় বাধা আসে খরচের দিকে থেকে মধ্যবিত্ত বা গরিব মানুষের পক্ষে অল্প সময়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা জোগার করা সম্ভব হয় না।
-তৃতীয় সমস্যা হচ্ছে দ্বিধা-দ্বন্ধ, ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে এই ওষুধে কিছু সমস্যা হয়। কখনও কখনও চিকিৎসকরা এই ঝুঁকি নিতে চান না। আবার কেউ কেউ ওই প্রাণের ঝুঁকিকেই বড় করে দেখেন। নিজের রোগীকে ওই ৫ শতাংশের মধ্যে ধরে নিয়ে আশঙ্কিত হতে পারেন। ফলে চিকিৎসায় সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়।
স্ট্রোকের রোগীদের আনুসাঙ্গিক চিকিৎসা ও রিহ্যাবিলিটেশন
স্ট্রোক রোগীকে হাসপাতালেই শুরু করতে হবে রিহ্যাবিলিটেশন, স্ট্রোকে আক্রান্ত হবার ২৪ ঘন্টা পর থেকেই ফিজিওথেরাপি শুরু করতে পারবেন। এই রিহ্যাবিলিটেশন পুরিপূর্ণ একটি টিমের মাধ্যমে করতে হবে- নিউরোলজিস্টের সাথে জরুরি বিভাগ ও ট্রমা কেয়ার বিভাগের চিকিৎসক, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স, ফিজিওথেরাপিস্ট, স্পিচ থেরাপিস্ট, পরিবার ও রোগীকে কাউসিলিং এর মাধ্যমে বুঝানো।
ওয়ার্ড বয়: তাঁরা বুঝেন কোন পরিস্থিতি কিভাবে সামলাতে হয়। সময়ে সময়ে ওষুধ দেয়া, ঠিকমতো খাবার খাওয়ানো, রক্তচাপ ঠিক রাখা, কুশন মেট্রেস/বেডসোর/শরীরে ক্ষত যাতে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা, চ্যানেল-ক্যাথিটার থেকে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখা ইত্যাদি। এছাড়া মানুষটিকে আগের মতো কর্মময় স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য অভিজ্ঞ ফিজিক্যাল মেডিসিন ও ফিজিওথেরাপিস্টের বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে কিছু সময় পর পর হাত-পা বিভিন্ন দিকে চালনা করা হয়, পাশ ফেরানো হয় যাকে বলে প্যাসিভ ফিজিওথেরাপি, রোগী একটু সুস্থ হওয়ার পর শুরু হয় অ্যাকটিভ ফিজিওথেরাপি। রোগীকে বসানো-উঠানো ও হাঁটা-চলা করানো হয়, সারাদিনে যতবার সম্ভব। রিস্ট ড্রপ, ফুট ড্রপ বা কোনও রকম বিকৃতি এড়াতে রাতে স্প্লিন্ট পরিয়ে রাখতে হবে। স্ট্রোকের পর শরীর কতটা সচল হবে তা নির্ভর করে ক্ষতিগ্রস্থ স্নায়ু কর্মক্ষম হচ্ছে ততদিন ব্যায়ামের সাহায্যে পেশি ও সন্ধিকে সচল রাখা। প্রথম ২-১ মাস দ্রুত কাজ হয়। ৬ মাস পর্যন্ত গোল্ডেন টাইম। এক থেকে দেড় বছর পর ফিজিওথেরাপি শুরু করলে তেমন কোন লাভ হয় না।








Leave a reply