লিভারের যে কোনও রোগ ভেষজে নিরাময় হয় জেনে নিন

|

লিভার বা যকৃত মানবদেহের একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর যন্ত্র। দেহের মুখ্য রসায়নগার বা ল্যাবরেটরির মতো, এই অঙ্গে বলা যায় দেহের সব রকম বিপাকীয় কার্যাদি সম্পন্ন হয়। পুষ্টি, সংবহন,রেচন প্রভৃতি নানা শারীরবৃত্তীয় কার্যাদির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। লিভার সুস্থ থাকলে দেহের সব কাজকর্ম স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন হয়। কোনও কারণে লিভার বা যকৃত একটু গন্ডগোল করলে দেহে নানারকম উপসর্গ ও রোগ-শোকের উদ্ভব হয়। দেহের হৃদযন্ত্র বিকল হলে দেহ দ্রুত নিথর হয়ে যায়, যকৃত ঠিকমতো কাজ না করলে এমনটি না হলেও ধীরে ধীরে প্রাণনাশী এমন অবস্থার সৃষ্টি করে যে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সৃষ্টি করে যে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার আর পথ থাকে নাম জীবন অকালে ঝরে পড়ে।

সম্প্রতি দেশে বিদেশ যকৃতঘটিত রোগ নিয়ে আধুনিক রীতিতে বহু অনুসন্ধান ও গবেষণাকর্ম অব্যাহত থাকলেও কয়েক হাজার বছর পূর্বে অতি প্রাচীনকালে ভারতীয় মুনি-ঋষিগণ যকৃত নিয়ে কম চিন্তাভাবনা করেননি। তাঁদের উল্লেখিত নিদান বা রীতিনীতি অনুসারে আধুনিক পারে না সেখানে নির্বাচিত বহু ভেষজ দ্রব্য সম্পূর্ণভাবে ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীনভাবে স্থায়ী নিরাময় দিতে সক্ষম হয়।

যকৃতঘটিত রোগে ভেষজ ব্যবহার

যকৃতের মধ্যে অস্বাভাবিকতা অর্থাৎ যকৃত বৃদ্ধি, যকৃত শূল, যকৃত ঠিকমতো কাজ না করলে বা পিত্তরস সঠিক পরিমাণে ক্ষরিত না হলে, যকৃত সংশ্লিষ্ট বিপাকীয় ক্রিয়াকে বিঘ্নিত হলে মানুষের দেহে নানা উপসর্গ বা রোগ-শোক দেখা দেয়। উক্ত বিষয়ভিত্তিক পর্যায়ে যকৃত সম্বন্ধে সচেতনতার সঙ্গে সঙ্গে ভেষজ দ্রব্যের ব্যবহারগুলি জানা থাকলে রোগ নিরাময় সহজ হয়।

অপস্তম্ভিনী বা শিবলিঙ্গী যকৃত রোগে খুবই উপকারী ভেষজ। এক্ষেত্রে দু’চামচ পরিমাণে পাতার রস হালকা গরম করে সেই রস সকালে ও বিকালে নিয়মিতভাবে কয়েকদিন খেলে লিভারের সব রোগ দ্রুত দূর হয়। আনুষঙ্গিকভাবে পেটে গ্যাস হওয়া, কোষ্ঠবদ্ধতা, খিটখিটে মেজাজ, গায়ের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া, ঘুসঘুসে জ্বর,প্রস্রাবের রোগ এই ভেষজ ব্যবহার সেরে যায়।

শ্লেষ্মাতক বা বহুবার বা শেলুগাছ যকৃত বা প্লীহা বৃদ্ধি রোগে ভালো ফল দেয়। এক্ষেত্রে বাজারজাত শেলফুল ৫ গ্রাম (শুকনা) ভালো করে থেঁতো করে তিন কাপ জলে সেদ্ধ করার পর ছেঁকে সেই জল দিনে দুবার করে কয়েকদিন খেলে ভালো ফল দেয়। আনুষঙ্গিকভাবে এই গাছ, অগ্নিমান্দ্য, কৃমি, মূত্রাঘাত, সর্দি, গন্ডমালা, জ্বর প্রভৃতি রোগে খুবই উপকার করে।

কোদ্রব বা কোদো গাছ যকৃত-প্লীহা বৃদ্ধিতে ও যকৃত রোগে ভালো কাজ করে। এক্ষেত্রে প্রথমে পরিষ্কার করে নিয়ে একটি সম্পূর্ণ কোদো গাছ সেদ্ধ করে ছেঁকে পাওয়া জল সারা দিনে দু’বার করে এমনভাবে এক সপ্তাহ খেতে হয়। রোগ চলে যায়। আনুষঙ্গিকভাবে এই গাছটি মেদ হ্রাসে, শূলব্যথা, অনিদ্রায়, প্রস্রাব রোগ, বাত রোগ প্রভৃতিতে ভালো কাজ করে।

অজশৃঙ্গী বা ক্ষীরলতা গাছ যকৃত-প্লীহা বৃদ্ধিতে ভালো কাজ করে। এক্ষেত্রে বাহ্যিকভাবে প্রতিদিন একটি করে পরিণত পাতা যকৃতের ওপর বসিয়ে রাখেলে কয়েকদিনের মধ্যে উপকার পাওয়া যায়। মতান্তরে পাতার রসও কয়েকদিন নিয়মিতভাবে খেলে দ্রুত ভালো ফল দেয়। আনুষঙ্গিকভাবে এই গাছ খাদ্যের বিষক্রিয়া, গুল্মরোগ, শূলরোগ, কফ, অরুচি, পেটের অন্যান্য রোগে খুবই উপকার করে।

অমৃততুম্বী বা পেঁপে যকৃত বৃদ্ধি রোগে ভালো ফল দেয়। এক্ষেত্রে ৩০ ফোঁটা পেঁপের আঠা এক চামচ চিনি মিশিয়ে এক কাপ জলে সরবত তৈরি করে ওই মিশ্রণটি দিনে তিনবার হিসাবে ৪-৫ দিন খেলে যকৃতের সব অসুবিধাগুলি দূর হয়। প্রয়োজনে আরও কয়েকদিন খেতে হতে পারে। আনুষুঙ্গকভাবে পেট ফাঁপা, আমাশা,কৃমি, রক্তার্শ, প্রবল জ্বর, দাদ, একজিমা ও কতকগুলি স্ত্রী রোগে পেঁপে গাছের প্রয়োগ খুবই কার্যকরী ভূমিকা নেয়।

গোধূম বা গম গাছ যকৃত বৃদ্ধি রোধে খুবই ভালো কাজ করে। এক্ষেত্রে আধ ভাঙা ২৫ গ্রাম বাজারজাত গম ৪ কাপ জলে সেদ্ধ করে এক কাপ থাকতে থাকতে নামিয়ে গমের ক্বাথ তৈরি করে দিনে দু’বার করে ২-৩ দিন খেলে রোগের উপশম পাওয়া যায়। এই ভেষজটি আনুষঙ্গিকভাবে শোথ, আমবাতে, খোস-প্যাঁচড়া, পেটের রোগ প্রভৃতিতে ভালো কাজ করে।

দাড়িম্ব বেদনা বিশেষত শিশুদের যকৃত বেড়ে গেলে ডালিম বা এই বেদনা গাছের মূলের ছাল চূর্ণ আধ গ্রাম পরিমাণে নিয়ে দু’চামচ দুধের সঙ্গে মিশিয়ে সামান্য মধু মিশিয়ে সকালে খাওয়ারে কয়েকদিনের মধ্যে দ্রুত উপকার পাওয়া যায়। আনুষঙ্গিকভাবে সব বয়সের মানুষের অনিদ্রা, শ্বেতপ্রদর, অতিসার,অজীর্ণ, আমাশয়, কৃমি, রক্তপিত্ত, হৃদরোগ, মূত্রঘটিত রোগ প্রভৃতিতে ভালো ফল দেয়।

কর্মরঙ্গ বা কামরাঙা গাছের ফলের রস যকৃত শূল রোগে খুবই উপকার করে। এক্ষেত্রে পাকা বাজারজাত কামরাঙার রস ৩-৪ চামচ পরিমাণে নিয়ে জলের সঙ্গে সরবত তৈরি করে ‍দিনে একবার করে ৪-৫ দিন খেলে উপকার হয়। এই কামরাঙার রস আনুষঙ্গিকভাবে অতিসার, অর্শ, বায়ুবিকার, পুরাতন জ্বর প্রর্ভতি রোগে ভালো ফল দেয়।

আকাশবল্লী বা স্বর্ণলতা গাছের হলুদ বর্ণের কান্ডাংশ যকৃত রোগে ভালো কাজ করে। এক্ষেত্রে এক গ্রাম লতা অংশ নিয়ে ভালো করে বেটে জলের সঙ্গে দিনে একবার করে কয়েকদিন খেলে দ্রুত রোগটি দূর হয়। এই গাছের অংশ আনুষঙ্গিভাবে পেট ফাঁপা, ঘুসঘুসে জ্বর, কৃমি, রক্তদুষ্টি প্রভাতিতে খুবই ভালো ফল দেয়।

অহিফেন বা আফিং গাছ যকৃত শূল রোগে ভালো কাজ করে। এক্ষেত্রে ২৫ মিলিগ্রাম বাজারজাত আফিং হালকা গরম দুধের সঙ্গে মিশিয়ে দিনে দু’বার করে কয়েকদিন খেলে অতি দ্রুত রোগটি দূর হয়।এই বাজারজাত আফিং আনুষঙ্গিকভাবে স্ত্রীরোগ. স্নায়ু পীড়ায়, কোমরের ব্যথায়, পেটের ব্যথা, পাথুরী, দাঁতের যন্ত্রণায়, কানের ব্যথা প্রভৃতিতে ভালো কাজ দেয়।

নিম্ব বা নিম গাছের ছাল যকৃত ব্যথার ভালো কাজ করে। এই ছাল আন্দাজে এক গ্রাম পরিমাণে নিয়ে তার সঙ্গে কাঁচা হলুদ আধ গ্রাম আমলকি গুঁড়ো এক গ্রাম নিয়ে ভালো করে মিশিয়ে জলের সঙ্গে সরবত তৈরি করে সকালে খালি পেটে কয়েকদিন খেলে সব দোষ দ্রুত দূর হয়। আনুষঙ্গিকভাবে বমি, রক্তশর্করা, অজীর্ণ, স্বপ্নদোষ, চক্ষুরোগ, সর্দিগর্মি, জ্বর, অরুচি প্রভৃতি রোগে উপকার করে।

বাস্ত্তক বা বেতো শাক অন্যান্য শাকের মতো রান্না করে কয়েকদিন খেলে লিভারের কাজ স্বাভাবিক হয়ে যায়। আনুষঙ্গিকভাবে এই বেতো শাক খেলে অজীর্ণ, অরুচি, রক্তার্শ, আমাশা, শোথ, অতিসার, কৃমি প্রভৃতি রোগ উপশম করে।

গ্রীষ্মসুন্দরক বা গিমে শাক তরকারি করে খেলে কিংবা সমগ্র গাছটিকে ছেঁচে রস তৈরি করে কয়েকদিন সকালে বা দিনে একবার করে খেলে যকৃতের সবরকম পীড়া দূর হয়। অনুষঙ্গিকভাবে এই ভেষজটি পেটের সবরকম রোগ, অম্লপিত্ত, চোখের রোগ, ত্বকের রোগ প্রভৃতিতে ভালো ফল দেয়।

হরিদ্রা বা হলুদ গাছের ভূমিম্নস্থ কান্ড বা বাজারজাত হলুদ যকৃত ঘটিকা পান্ডুরোগে ভালো কাজ করে। এক্ষেত্রে এক চামচ কাঁচা হলুদের রস একটু চিনি বা মধু মিশিয়ে দিনে একবার করে ৪-৫ দিন খেলে রোগের উপশম হয়। আনুষুঙ্গকভাবে এই হলুদ প্রমেহ রোগে, কৃমি, তোতলামি, হাঁপানি, অ্যালার্জি, স্বরভঙ্গ, হাম জ্বর, ফাইলেরিয়া প্রভৃতি রোগে ভালো ফল দেয়।

তিক্তপাট বা পাটশাক যকৃত রোগে ভালো কাজ করে। এক্ষেত্রে এক-দেড় গ্রাম মাত্রায় পরিণত পরিচ্ছন্ন পাট পাতা এক কাপ জলে ভিজিয়ে রাতে রেখে পরের দিন সকালে ছেঁকে জলটাই কেবল সকালে খালি পেটে খেতে হবে। এভাবে ৩-৪ দিন খেলে উপকার বোঝা যাবে। প্রয়োজন হলে আরও কয়েকদিন খেতে হবে। আনুষঙ্গিকভাবে পেটের বায়ু, পেটের অসুখ, রক্ত আমাশা, ঘুসঘুসে জ্বর, অম্লপিত্ত, কলিক ব্যথা, মূত্রাশয় ঘটিত রোগ প্রভৃতিতে পাট গাছের প্রয়োগ পাওয়া যায়।

রোহিতক গাছের ছাল ও বীজের তেল বহু রোগে উপকার করে। এক্ষেত্রে যকৃত রোগে ৪-৫ গ্রাম রোহিতক ছাল এক কাপ জলে ১০-১২ ঘন্টা ডুবিয়ে রেখে পরে ছেঁকে তরল অংশটাই কেবল সকালে কিছু খেয়ে তারপর খেতে হবে। তিন-চার দিন খেলে যকৃতের সব উপসর্গ দূর হয়। আনুষঙ্গিকভাবে রোহিতক গাছ অর্শ, রক্তপ্রদর, কৃমি, পেটের বহু রোগে খুবই ভালো ফল দেয়।

ইক্ষবাকু বা তিৎলাই যকৃৎে দোষ ও কামলায় ভালো কাজ দেয়। এই লাউয়ের পাতার রস চিনি মিশিয়ে খেলে বা সরবত তৈরি করে কয়েকদিন খেলে যকৃত স্বাভাবিকভাবে কাজ করে। আনুষঙ্গিভাবে কোষ্ঠবদ্ধতা, অর্শ, গলগন্ড, প্রদর, হাত-পায়ের জ্বালা, শিরঃশূল, ক্ষত নিরাময়ে, কর্ণ রোগ, নাসার্শ রোগ, পা ফাটা, বাত প্রভৃতিতে লাউ গাছের প্রয়োগ ভালো কাজ দেয়।
যকৃতের ব্যাপারে বিশেষ কিছু কথা

যকৃতের রোগে বলা যায় বেশিরভাগ মানুষই কমবেশি ভোগেন। এরজন্য অনেক অসুবিধার সম্মখীন হতে হয়। উপসর্গগুলি জটিল হলেই দেহের অসুস্থতা অসহনীয় হয়ে ওঠে। তখনই রোগ নিরাময়ের জন্য ছোটাছুটি করতে হয়।

যকৃত থেকে যেসব দুরারোগ্য রোগ প্রকাশিত হয় সেগুলির প্রায় সবই অতি প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসা পদ্ধতি বা আয়ুর্বেদ চিকিৎসার দ্বারা সম্পূর্ণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীনভাবে নিরাময় হয়। এক্ষেত্রে কেবলমাত্র প্রয়োজন ভেষজ দ্রব্যটির সম্বন্ধে পরিচিত ও অনুসন্ধান। সঠিক পরিচিতি থাকলে অনুসন্ধান সহজ হয়।








Leave a reply