রং ফর্সাকারী জনপ্রিয় পিল জীবন ধ্বংসকারী নয় তো?

|

বেশ কিছুদিন যাবত অনলাইনে একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছিল। পরে আরও কিছু অনলাইন পেইজের বাস্তবতা দেখতে পাই যা দেখে আমি যারপরনাই রাগান্বিত এবং অসহায় বোধ করছি। কিছু ভূইফোড় অনলাইন পেইজে একইসাথে ব্রণের ট্রিটমেন্ট এবং রং ফর্সা করে এমন একটি ট্যাবলেটের বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে। দেখলাম এটি আর কিছুই নয়, এক ধরনের ওরাল কন্ট্রাসেপটিভ প্রিপারেশন (Diane 35) বা সহজ বাংলায় যাকে জন্ম নিয়ন্ত্রণের বড়ি বলে! স্টেরয়েড মাখিয়ে আর খাইয়ে কম বারোটা বাজে নি যে এভাবে দেদারসে পিলের বিজ্ঞাপন চলছে! তাই এ ধরনের ঔষধের বিষয়ে আপনাদের সাবধান করার জন্যই আজকের লেখা। চলুন তবে দেখে নেই রং ফর্সাকারী জনপ্রিয় পিল কতটা ক্ষতিকর!

রং ফর্সাকারী জনপ্রিয় পিল যেভাবে ধ্বংস করছে আপনার জীবন
কী ধরনের ঔষধ এটি?
এটি আসলে এক ধরনের কন্ট্রাসেপটিভ পিল। সাইপ্রোটেরন ও এথিনাইল এস্ট্রেডিওলর (Cyproterone & Ethinyl Estradiol) নামক দু’ধরনের পদার্থের সমন্বয়ে এটি এক ধরনের জন্ম নিয়ন্ত্রণকরণ পিল তবে কন্ট্রাসেপশনের চেয়ে পলিসিস্টের রোগীদের ক্ষেত্রে এটির ব্যবহার বেশি। স্কুলে বিজ্ঞান ক্লাসে একটি প্রচলিত বাক্য “সকল ক্ষারই ক্ষারক কিন্তু সকল ক্ষারকই ক্ষার নয়“। ঠিক তেমন এক্ষেত্রে বলা যায় পলিসিস্টের জন্য ব্রণ হয় কিন্তু সকল ব্রণের পেছনেই পলিসিস্ট আছে সেটি নয়। পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম এমন একটি সমস্যা যেখানে মেয়েদের দেহে ছেলেদের হরমোন বেড়ে যায় ফলে ব্রণ হওয়া, অবাঞ্চিত দাড়ি গোফ গজানোর মতো সমস্যা তৈরি হয়।

এ ধরনের সমস্যায় ভুগছেন মানুষদের ক্ষেত্রেই এই পিল বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে ব্রণ আছে বলেই ধুপধাপ পিল ধরিয়ে দিবেন এটা কখনোই মেনে নেয়া যায় না। এই পিলের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া আছে যে অন্য কোন ঔষধ (মাখার ক্রিম, ওরাল অ্যান্টি-বায়োটিক ইত্যাদি) কাজ না করলে এবং অবশ্যই উপসর্গ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম কনফার্ম হলেই তবে শেষ চিকিৎসা হিসেবে এই পিল দেয়া যেতে পারে এবং অবশ্যই তা অল্প দিনের জন্য।

কী ক্ষতি হয় এই রং ফর্সাকারী জনপ্রিয় পিল সেবনে?
কন্ট্রাসেপটিভ পিলের সাইড এফেক্ট কী হতে পারে তা সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা হয়তো আপনাদের আছে। তবুও বলছি কিছু কমন সমস্যার কথা। সেগুলো হলো-

১) বমিভাব

২) মাথা ব্যথা

৩) পেট ব্যথা

৪) অনিয়মিত মাসিক

তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত আর লিখছি না। সরাসরি চলে আসি আজকের মূল বিষয়ে।

ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিসসের সাথে রং ফর্সাকারী পিলের সম্পর্ক
ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস (deep vein thrombosis) নামক একটি সিরিয়াস অসুখের সাথে এই পিলের সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছে। এই অসুখে ভেইন বা শিরাতে অনুচক্রিকা অর্থাৎ থ্রম্বোসাইট, রক্তের চাকা তৈরি করে। ফলে রক্ত সঞ্চালন বাধাপ্রাপ্ত হয়। ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস যেকোন শিরাতেই হতে পারে। তবে সাধারণত হাত-পায়ের শিরায় বেশি হয় এবং মানুষের চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, তীব্র ব্যথা অনুভূত হয় এবং যদি থ্রম্বোসিস ফুসফুসের শিরাতে তৈরি হয় তবে তা মারণঘাতি হতে পারে।

তিন বছর আগে অস্ট্রেলিয়ান একজন এম.পি এর কন্যা এই পিল খাওয়ার পর ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিসের সমস্যা হলে সবাই এ ঔষধ নিয়ে নড়েচড়ে বসে। অথচ এর আগে থেকেই ফ্রান্সে অল্প আর ইউএসএ-তে পুরোপুরিই এ ঔষধ ব্যান হয়ে আছে। সাধারণত কিছু মেডিকেল হিস্ট্রি নেয়ার পর এবং প্রয়োজনীয় কিছু ইনভেস্টিগেশনের পর কনফার্ম হয়েই কেবল এ ধরনের ঔষধ প্রেসক্রাইব করা হয় উচিত। কিন্তু যারা রং ফর্সা করার কথা বলে বা ব্রণ কমানোর দাবী করে এ ধরনের ঔষধ দেদারসে বিক্রি করছেন তারা নিশ্চয়ই এতকিছু জেনে বিক্রি করছেন না!

আসলেই কি এই ঔষধে রং ফর্সা হয়?
এ বিষয়টি জানার জন্য নিশ্চয়ই আপনাদের মন এতক্ষণ খুব উদগ্রীব হয়ে ছিল? আসলে এর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। একটাই ব্যাখ্যা সান্ত্বনা স্বরূপ দাঁড় করাতে পারি যে, যেহেতু এই পিলে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা অধিক তাই আপাতদৃষ্টিতে গ্লো আছে বলে মনে হতে পারে। যেমনটা গর্ভকালীন সেকেন্ড ট্রাইমেস্টারে দেখা যায় ইস্ট্রোজেনের আধিক্য হলে, ঠিক তেমনই। কিন্তু সেটা তাহলে ইস্ট্রোজেন আছে এমন যেকোন পিল থেকেই পেতে পারেন। দেহে প্রতিটি হরমোনের মাত্রা সঠিক থাকা বাঞ্ছনীয়। তা ইস্ট্রোজেনের ক্ষেত্রেও প্রোযোজ্য। ইস্ট্রোজেনের আধিক্য হলে ব্রেস্টের ফাইব্রোসিস্ট, অনিয়মিত মাসিক, মুখে ছোপ ছোপ দাগ, ওজন বেড়ে বা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। সবচেয়ে ভয়ংকর আমার কাছে যে বিষয়টি মনে হয় যে যেসব নারীরা সন্তান ধারণের চেষ্টা করছেন তারা যদি একে শুধু ব্রণ কমানোর বা ফর্সা হওয়ার ঔষধ ভেবে খেতে থাকেন তাহলে কী হবে? তিনি বা তার পরিবার হয়তো বুঝেই পাচ্ছেন না সন্তান কেন হচ্ছে না অথচ এর পেছনে তার এই ব্রণ দূর করা রং ফর্সাকারী পিল দায়ী!

একজন ডাক্তার হিসেবে জনসচেতনতা গড়তে অনুরোধ করবো যে, এ ধরনের ঔষধ বা পিল গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। শুধুমাত্র বাহ্যিক রং ফর্সা করার পেছনে না ছুটে, সচেতন হয়ে সুন্দর করুন ভবিষ্যত জীবনকে। না বুঝে নিজের ক্ষতি আর করবেন না। এ ধরনের মারণঘাতি প্রোডাক্টের বাজারকে আশা করি আর বাড়তে দিবেন না। সচেতন হোন, সুস্থ থাকুন!








Leave a reply