মায়োপিয়া স্থিতিশীল রাখতে চশমা পরতেই হবে

|

মায়োপিয়া কথাটি মায়োপস নামক গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে। মায়োপস মানে শর্ট সাইটেড অর্থাৎ দূরের জিনিস দেখতে অসুবিধে। বর্তমানে মায়োপিয়া চোখের একটি অত্যন্ত পরিচিত অসুখ। পৃথিবীর মধ্যে সব থেকে বেশি মায়োপিয়া রোগী দেখা যায় সিঙ্গাপুরে, প্রায় শতকরা হিসেবে একাত্তর ভাগ। যদিও ভারতে এই ধরনের কোনো তথ্য নেই কিন্তু ভারতেও এই ধরনের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এরা কাছের জিনিস ভালো দেখতে পেলেও চশম ছাড়া দূরের জিনিস দেখতে পায় না।

মায়োপিয়ার কারণ: মায়োপিয়ায় আমাদের চোখে আলোর রশ্মিগুলো রেটিনার ওপর ফোকাসড না হয়ে রেটিনার সামনে ফোকাসড হয়। এটা দুটো কারণে হতে পারে, আই বলটা যদি নর্মাল সাইজের থেকে বড় হয় অথবা চোখের যে লেন্স আছে সেই লেন্সটা যদি নর্মালের থেকে মোটা বা স্ট্রং হয়। দুটো ক্ষেত্রেই স্ট্রং লেন্স হলেও ফোকাসটা সামনে হয়ে যাচ্ছে, আইবলটার বড় লেন্স নর্মাল হলেও চোখের সামনে আলোর রশ্মিগুলো ফোকাস হয়ে যাচ্ছে। এইসব ক্ষেত্রে চশমা বা কন্ট্যাক্ট লেন্সের সাহায্যে রেটিনার ওপর আলোর রশ্মিগুলো ফোকাস করলে তবেই ভালো করে দেখা সম্ভব।

মায়োপিয়ার পিছনে অনেক সময় হেরিডিটি কাজ করে। বাবা-মা’র যদি মাইনাস পাওয়ার থাকে তাহলে তাদের বাচ্চাদেরও মাইনাস পাওয়ার হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কিংবা দাদা বা ভাইয়ের মাইনাস পাওয়ার থাকলে বোনোরও মাইনাস পাওয়ার হবার সম্ভাবনা থাকে। এই হেরিডেটারি ফ্যাক্টর ছাড়াও একটা সোসিও ইকোনমিক ফ্যাক্টর দেখা যায়। যারা বেশিক্ষণ ঘরের মধ্যে কাটায় বা যারা বেশিক্ষণ ক্লোজ ওয়ার্ক করে বা হায়ার সোসিও ইকোনমিক গ্রুপে মায়োপিয়া হবার সম্ভাবনা বেশি দেখা যায়।

এদের প্রধান সমস্যা হল দূরে দেখার অসুবিধে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করতে না পারলে লেজি আই হবার সম্ভাবনা দেখা যায়। একবার লেজি আই হলে পরে চশমা দিয়েও দৃষ্টিতে উন্নত করা যায় না।

চিকিৎসা: বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সব থেকে সঠিক ও সহজ পদ্ধতি হল চশমার ব্যবহার। তারপরে যখন নিজেদের যত্ন নিতে শেখে তখনএকটা বয়সেরপর কন্ট্যাক্ট লেন্স দেওয়া যেতে পারে। এরপর মায়োপিয়া যখন স্থিতিশীল হয়, একটা বয়সের পরে তখন অপারেশন করে মাইনাস পাওয়ার পুরোপুরি কাটিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

হাই মাইনাস পাওয়ার হলে চশমার কাচ অনেক ভারি হয়। সেক্ষেত্রে চশমার সেন্টার দিয়ে না দেখলে হাই মাইনাস পাওয়ারের রোগীরা ঠিকমতো দেখতে পায় না। অস্বচ্ছতা রয়ে যায়, যাকে ক্রোমাটিক অ্যাব্রেশন বলে।

এই অসুবিধে কনট্যাক্ট লেন্স পরলে পুরোপুরি চলে যায়। কিন্তু কন্ট্যাক্ট লেন্সের ঠিকমতো যত্ন না নেওয়ার কারণে ড্রাই আই হবারও সম্ভাবনা থাকে। যখন বাবা-মা বাচ্চাদের নিয়ে কোনো চোখের ডাক্তারের কাছে যান, তখন তাদের একটাই প্রশ্ন থাকে, ঠিকমতো চশমা পরলে কি মাইনাস পাওয়ারটা চলে যাবে? এর একটাই উত্তর না।

বাচ্চাদের চোখ পরীক্ষা করার পর মাইনাস পাওয়ার যখন ধরা পড়ে তখন তাদের গ্রোইং এজ আঠেরো বছর পর্যন্ত মাইনাস পাওয়ার বাড়তেই থাকে দুর্ভাগ্যজনক হিসেবে।

চশমা কী সাহায্য করে: প্রতিবিম্বটা যাতে ফোকাসড হয় এবং সঠিকভাবে দেখতে সুবিধে হয়। কিন্তু চশমা পরলেও পাওয়ার যা বাড়ার বাড়বে।

সার্জারি: এখন বিভিন্ন ধরনের সার্জারি এসে গেছে। সাধারণত সার্জারি বলতে ল্যাসিককেই বোঝায়। ল্যাসিকের দ্বারা কর্নিয়ার শেপটাকে পরিবর্তন করে মাইনাস পাওয়ারকে কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

এছাড়া আছে PRK বা LASEK । এগুলো সবই কর্নিয়ার অপারেশন। কর্নিয়ার সার্জারি করে মাইনাস পাওয়ার কমিয়ে দেওয়া হয়।

এছাড়া আছে PHAKIC IOL। যাতে আমাদের ন্যাচারাল লেন্সের ওপরে একটা পাতলা আর্টিফিশিয়াল লেন্স চোখের ভিতরে বসিয়ে মাইনাস পাওয়ারকে সঠিকভাবে ঠিক করে দেওয়া হয়।

তৃতীয় অপারশন হলClear lens extrac-tion । ক্যাটারাক্ট হওয়ার পরে সাধারণত বার করে দেওয়া হয় ন্যাচারাল লেন্সটা। ওখানে একটা আর্টিফিশিয়াল লেন্স বসিয়ে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ক্যাটারাক্ট হবার আগেই পুরো লেন্সটা বার করে দেওয়া হয় এবং তার জায়গায় একটা আর্টিফিশিয়াল লেন্স বসিয়ে দেওয়া হয় যেটা পাওয়ারকে ঠিক করে দেয়।এই তিন ধরনের অপারেশনের সাহায্যে মায়োপিয়াকে কমিয়ে ফেলা সম্ভব।

মায়োপিক রোগীদের কিছু কিছু কমপ্লিকেশন হবার সম্ভাবনা থাকে। সব থেকে বেশি যে জটিলতা দেখা দেয় তা হল যেহেতু এদের চোখের মনিটা বড় থাকে, রেটিনা কিছু কিছু জায়গায় স্ট্রেচড হয়ে যেতে পারে, ছিড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে, যাকে Lattice degeneration বলে। ল্যাটিস ডিজেনারেশন হলে বা হাই মাইনাস পাওয়ার থেকে রেটিনা ফুটো হয়ে গেলে বা রেটিনা ছিড়ে গেলে রেটিনা ডিটাচমেন্ট বা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এইজন্যডাক্তারবাবুরা সবসময় মায়োপিক রোগীদের সাবধান করে দেন চোখে যদি হঠাৎ করে অংখ্য ফুলকি বা আলোর ঝলখানি দেখেন তাহলে যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারবাবুর পরামর্শ নিন।

এক্ষেত্রে রেটিনা ছেড়া অবস্থায়, ফুটো অবস্থায় ডায়াগনোসিস করতে পারলে লেজার দিয়েই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রেটিনার বিচ্ছিন্নাতা বা ডিটাচমেন্টকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।

রেটিনা ডিটাচমেন্ট একবার হয়ে গেলে শুধু যে সেটা খরচসাপেক্ষ অপারেশন তাই নয়, তার সাথে সাথে দৃষ্টি পুরোপুরি নাও ফিরতে পারে। রেটিনার হোল বা রেটিনাকে লেসার করে বা ক্রায়ো করে দিয়ে রেটিনার বিচ্ছিন্নতাকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে

এছাড়া খো গেছে মায়োপিক রোগীদের ক্যাটারাক্ট হবার সম্ভাবনা তাড়াতাড়ি থাকে এবং গ্লুকোমা হবার সম্ভাবনাও বেশি থাকে। কিন্তু সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল রেটিনার সমস্যা।

এছাড়া হাই মাইনাস পাওয়ারের রোগীদের রেটিনার তলায় নতুন রক্ত শিরা জন্মায় এবং তার থেকে রক্ত ক্ষরণ হয়েও দৃষ্টিশক্তি চলে যেতে পারে। গ্লুকোমা হবার সম্ভাবনাও বেশি থাকে। কিন্তু সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল রেটিনার সমস্যা।

এছাড়া হাই মাইনাস পাওয়ারের রোগীদের রেটিনার তলায় নতুন রক্তশিরা জন্মায় এবং তার থেকে রক্ত ক্ষরণ হয়েও দৃষ্টিশক্তি চলে যেতে পারে, যাকে মায়োপিক সি.এন.ভি.এম বলে।

মায়োপিক প্রতিরোধ করার কোনো উপায় এখনও বেরোয়নি, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সার্জারি করে স্ক্লেরার ওপরে আরও একটা স্ক্লেরা বসিয়ে দিয়ে আইবলটা যাতে বড় না হয়ে যায় তার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাফল্য আসেনি। অনেকের ধারণা কনট্যাক্ট লেন্স পরলে মায়োপিয়া বাড়ে না। এই ধারণাটাও ভুল।

মায়োপিয়া যেটুকু বাড়ার বাড়বেই। সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে বাইরে খেলাধুলোয়র মধ্যে যদি বেশি করে সময় ব্যয় করে ছেলেমেয়েরা তাহলে মায়োপিয়ার গ্রোথটা অনেকটাই কমে। সাধারণ প্রাকৃতিক আলো মায়োপিয়াকে বাড়তে দেয় না। তাই ডাক্তারদের বক্তব্য, বাচ্চারা বাইরের সূর্যালোকে যতটা পারে খেলাধুলো করুক। সারাক্ষণ ঘরে টিভি ও কম্পিউটার গেম যেন না খেলে।








Leave a reply