কাঁচা ছোলা খাওয়ার ১৬ স্বাস্থ্য উপকারিতা : কাঁচা ছোলা খাওয়ার নিয়মসহ

|

স্বাস্থ্যকর খাবার হিসাবে ছোলা বা বুটের বেশ সুনাম। এটা মুখরোচকও বটে। শক্তি দেয়। পেটেও থাকে বেশিক্ষণ। কাঁচা ছোলার গুণ সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যপোযগী ছোলায় আমিষ বা প্রোটিন প্রায় ১৮ গ্রাম, শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট প্রায় ৬৫ গ্রাম, ফ্যাট বা তেল মাত্র ৫ গ্রাম। ছোলার শর্করা বা কার্বোহাইডেটের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম। খাওয়ার পর খুব তাড়াতাড়িই হজম হয়ে গ্লুকোজ হয়ে রক্তে চলে যায় না। বেশ সময় নেয়। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ছোলার শর্করা ভাল। ছোলার ফ্যাট বা তেলের বেশির ভাগই পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাট ছাড়া ছোলায় আরও আছে বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ লবন। প্রতি ১০০ গ্রাম ছোলায় ক্যালসিয়াম আছে প্রায় ২০০ মিলিগ্রাম, লৌহ ১০ মিলিগ্রাম, ও ভিটামিন এ ১৯০ মাইক্রোগ্রাম। এ ছাড়াও আছে ভিটামিন বি­­-১, বি-২, ফসফরাস ও ম্যাগনেশিয়াম। এ সবই শরীরের জন্য কাজে লাগে।

সাধারণত দুই প্রকারের ছোলা পাওয়া যায়: দেশী ছোলা ও কাবুলী ছোলা। দেশী ছোলা আকারে ছোট, একটু কালচে রংয়ের এবং অপেক্ষাকৃত শক্ত। কাবুলী ছোলা একটু বড় আকারের, উজ্জ্বলতর রং এবং দেশী ছোলার চেয়ে নরম। দেশী ছোলা এই উপমহাদেশে পাওয়া যায়।

আমাদের ইফতারীর ছোলা মূলত দেশী ছোলা।শুধুমাত্র রোজা আসলেই নয়, আজকাল আমরা সবসময় ছোলা খাই এবং খাওয়া উচিত। কাবুলী ছোলা জন্মায় আফগানিস্তান, দক্ষিণ ইউরোপ- এসব স্থানে। ছোলা অত্যন্ত পুষ্টিকর। এটি আমিষের একটি উল্লেখযোগ্য উৎস। ছোলায় আমিষের পরিমাণ মাংস বা মাছের আমিষের পরিমাণের প্রায় সমান। তাই খাদ্য তালিকায় ছোলা থাকলে মাছ মাংসের প্রয়োজন পরে না। ত্বকে আনে মসৃণতা। কাঁচা ছোলা ভীষণ উপকারী। আমাদের দেশের মত গরীব দেশে ছোলাকে মাছ বা মাংসের বিকল্প হিসাবেও ভাবা যেতে পারে। ছোলার ডাল, তরকারিতে ছোলা, সেদ্ধ ছোলা ভাজি, ছোলার বেসন- নানান উপায়ে ছোলা খাওয়া যায়। তবে ছোলার ডালের তৈরি ভাজা-পোড়া খাবার যত কম খাওয়া যায় ততই ভালো। তাই হজমশক্তি বুঝে ছোলা হোক পরিবারের শক্তি।
উচ্চমাত্রার প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার ছোলা। কাঁচা, সেদ্ধ বা তরকারি রান্না করেও খাওয়া যায়। কাঁচা ছোলা ভিজিয়ে, খোসা ছাড়িয়ে, কাঁচা আদার সঙ্গে খেলে শরীরে একই সঙ্গে আমিষ ও অ্যান্টিবায়োটিক যাবে। আমিষ মানুষকে শক্তিশালী ও স্বাস্থ্যবান বানায়। আর অ্যান্টিবায়োটিক যেকোনো অসুখের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। ছোলার কিছু চমকপ্রদ গুণাগুণ হল-

ডাল হিসেবে: ছোলা পুষ্টিকর একটি ডাল। এটি মলিবেডনাম এবং ম্যাঙ্গানিজ এর চমৎকার উৎস। ছোলাতে প্রচুর পরিমাণে ফলেট এবং খাদ্য আঁশ আছে সেই সাথে আছে আমিষ, ট্রিপট্যোফান, কপার, ফসফরাস এবং আয়রণ।

হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে: অস্ট্রেলিয়ান গবেষকরা দেখিয়েছেন যে খাবারে ছোলা যুক্ত করলে টোটাল কোলেস্টেরল এবং খারাপ কোলেস্টেরল এর পরিমাণ কমে যায়। ছোলাতে দ্রবণীয় এবং অদ্রবণীয় উভয় ধরনের খাদ্য আঁশ আছে যা হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। আঁশ, পটাসিয়াম, ভিটামিন ‘সি’ এবং ভিটামিন বি-৬ হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যায়। এর ডাল আঁশসমৃদ্ধ যা রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন ৪০৬৯ মিলিগ্রাম ছোলা খায়, হৃদরোগ থেকে তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি ৪৯% কমে যায়।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে:
আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখানো হয় যে, যে সকল অল্পবয়সী নারীরা বেশি পরিমাণে ফলিকএসিডযুক্ত খাবার খান তাদের হাইপারটেনশন এর প্রবণতা কমে যায়। যেহেতু ছোলায় বেশ ভাল পরিমাণ ফলিক এসিড থাকে সেহেতু ছোলা খেলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। এছাড়া ছোলা বয়সসন্ধি পরবর্তীকালে মেয়েদের হার্ট ভাল রাখতেও সাহায্য করে।

রক্ত চলাচল: অপর এক গবেষণায় দেখা গেছে যে যারা প্রতিদিন ১/২ কাপ ছোলা, শিম এবং মটর খায় তাদের পায়ের আর্টারিতে রক্ত চলাচল বেড়ে যায়। তাছাড়া ছোলায় অবস্থিত আইসোফ্লাভন ইস্কেমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তিদের আর্টারির কার্যক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয় ।

ক্যান্সার রোধে: কোরিয়ান গবেষকরা তাদের গবেষণায় প্রমাণ করেছেন যে বেশি পরিমাণ ফলিক এসিড খাবারের সাথে গ্রহণের মাধ্যমে নারীরা কোলন ক্যান্সার এবং রেক্টাল ক্যান্সার এর ঝুঁকি থেকে নিজিদেরকে মুক্ত রাখতে পারেন। এছাড়া ফলিক এসিড রক্তের অ্যালার্জির পরিমাণ কমিয়ে এ্যজমার প্রকোপও কমিয়ে দেয়। আর তাই নিয়মিত ছোলা খান এবং সুস্থ থাকুন।

রমজানে: রমজান মাসে ইফতারের সময় জনপ্রিয় খাবার হলো ছোলা। প্রচুর পরিমাণে পটাসিয়াম থাকার কারণে রমজানে ছোলা অত্যন্ত উপকারি একটি খাবার। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে, হাড় শক্ত করতে এবং দেহকে দৃঢ় করতে ছোলার জুড়ি মেলা ভার।

কোলেস্টেরল: ছোলা শরীরের অপ্রয়োজনীয় কোলেস্টেরল কমিয়ে দেয়। ছোলার ফ্যাট বা তেলের বেশির ভাগ পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাট ছাড়া ছোলায় আরও আছে বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ লবণ।

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে: ছোলায় খাদ্য-আঁশও আছে বেশ। এ আঁশ কোষ্ঠকাঠিন্য সারায়। খাবারের আঁশ হজম হয় না। এভাবেই খাদ্যনালী অতিক্রম করতে থাকে। তাই পায়খানার পরিমাণ বাড়ে এবং পায়খানা নরম থাকে।ফলে হজম শক্তি বৃদ্ধি করে।

ডায়াবেটিসে উপকারী: এই ছোলায় রয়েছে উচ্চ আঁশ; তাই এটি ডাল হিসেবে অনেক উন্নত। বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ছোলা খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা খুব ধীরে ধীরে বাড়লে এবং ছোলার আঁশ রক্তে উপস্থিত গ্লুকোজের মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। সেই জন্য ডায়াবেটিক রোগীর ক্ষেত্রে ছোলার কোনো জুরি নেই।

যৌনশক্তি বৃদ্ধিতে ও কফ সারাতে: যৌনশক্তি বৃদ্ধিতে এর ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। শ্বাসনালিতে জমে থাকা পুরনো কাশি বা কফের জন্যেও ভালো কাজ করে ছোলা। ছোলা বা বুটের শাকও শরীরের জন্য ভীষণ উপকারী। প্রচুর পরিমাণে ডায়াটারি ফাইবার বা আঁশ থাকার কারণে ছোলা যৌনশক্তি বৃদ্ধি করে। ডায়াটারি ফাইবার খাবারে অবস্থিত পাতলা আঁশ, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। তাই শুধু রমজান মাস নয়, ১২ মাসেই ছোলা হোক আপনার সঙ্গী।

রক্তের চর্বি কমায়ঃ ছোলার ফ্যাটের বেশিরভাগই পলি আনস্যাচুয়েটেড। এই ফ্যাট শরীরের জন্য মোটেই ক্ষতিকর নয়, বরং রক্তের চর্বি কমায়।

অস্থির ভাব দূর করেঃ ছোলায় শর্করার গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের পরিমাণ কম থাকায় শরীরে প্রবেশ করার পর অস্থির ভাব দূর হয়।

রোগ প্রতিরোধ করেঃ কাঁচা ছোলা ভিজিয়ে কাঁচা আদার সঙ্গে খেলে শরীরে আমিষ ও অ্যান্টিবায়োটিকের চাহিদা পূরণ হয়। আমিষ মানুষকে শক্তিশালী ও স্বাস্থ্যবান বানায় এবং অ্যান্টিবায়োটিক যে কোনো অসুখের জন্য প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

জ্বালাপোড়া দূর করেঃ সালফার নামক খাদ্য উপাদান থাকে এই ছোলাতে। সালফার মাথা গরম হয়ে যাওয়া, হাত-পায়ের তলায় জ্বালাপোড়া কমায় তথা হাত ও পায়ের তালুর জ্বালাপোড়া দূর করে।

মেরুদণ্ডের ব্যথা দূর করেঃ এছাড়াও এতে ভিটামিন ‘বি’ও আছে পর্যাপ্ত পরিমাণে। ভিটামিন ‘বি’ মেরুদণ্ডের ব্যথা, স্নায়ুর দুর্বলতা কমায়।

শরীরে শক্তির যোগান: শরীরে শক্তির যোগান দিতে থাকে দীর্ঘক্ষণ ধরে। প্রতি ১০০ গ্রাম ছোলা থেকে পাওয়া যায় ৩৬০ ক্যালরিরও অধিক শক্তি।
এ ছাড়া যাঁরা ওজন কমাতে চান, তাঁদের ছোলা, টক দই, সবজি খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকের ডায়েটেশিয়ানরা। কেননা ছোলার আঁশ শরীরে ওজন কমাতে সাহায্য করে।

প্রোটিনের চাহিদা পূরণে আমাদের মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, ডাল সবই খেতে হয়। যার মধ্যে প্রাণিজ প্রোটিন ফার্স্ট ক্লাস আর সেকেন্ড ক্লাস প্রোটিন হিসেবে আমরা ডাল ও বাদাম খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকি। যাঁদের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি, তাঁদের প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করা বাদ দেয়া যাবে না। সেই জন্য মাছ, মাংস কমিয়ে প্রোটিনের সেই চাহিদা যদি ছোলা থেকে পূরণ করা যায় তবে সহসাই রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে পারবেন।

এ ছাড়া ছোলা আমাদের দেশে সাধারণত দুভাবে খাওয়া হয়। একটি হচ্ছে আস্ত ছোলা, যেটাকে আমরা অনেক সময় ভেজে খাই বা সিদ্ধ করে খাই। আরেকটি হচ্ছে ছোলার ছাতু। আমাদের গ্রামাঞ্চলে অনেক সময় ছোলাকে গুঁড়ো করে এই ছাতু ব্যবহার করা হয়। যাঁদের ওজন বাড়ানো প্রয়োজন হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে এবং বাচ্চাদের খাবারে এই ছোলার ছাতু ব্যবহার হয়ে থাকে।

রোজার সময় প্রচুর তেল দিয়ে ছোলাকে ভুনে খাওয়া হয়। যেকোনো খাবারে অনেক পুষ্টি রয়েছে। আর এই পুষ্টি পাবেন আপনি রান্নার ওপর। তাই খুব বেশি তেল দিয়ে ছোলা ভুনে এর পুষ্টিগুণ নষ্ট করবেন না। বরং ছোলা সিদ্ধ করে তার সঙ্গে টমেটো, শসা, কাঁচামরিচ, তার সঙ্গে একটু অলিভঅয়েল বা সরিষার তেল মিশিয়ে নিলে সেটাই স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী হবে।রোজা ছাড়াও যাঁরা নিয়মিত ব্যায়াম করে থাকেন, তাঁরা ছোলাটা একটি মিল হিসেবে রাখতে পারেন। বিশেষ করে ছোলার সঙ্গে যদি টক দই মিলিয়ে খাওয়া যায়, তাহলে ফাস্ট ক্লাস এবং সেকেন্ড ক্লাস দুটো প্রোটিনই পেয়ে আপনি যাবেন।








Leave a reply