সৌমিত্রবাবু কেমন আছেন, মুম্বাই থেকে অমিতাভ

|

রোববার বিছানা ছেড়ে উঠে বসেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ফিজিওথেরাপি চলছে। চিকিৎসকেরা চেষ্টা করছেন, দু–এক দিনের মধ্যে কোনো কিছুতে ভর দিয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ এ শিল্পীকে হাঁটানো যায় কি না। সার্বিক পরিস্থিতি দেখে বোঝা যায়, সত্যজিতের ‘অপু’কে সুস্থ–স্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টা করছেন কলকাতার বেলভিউ নার্সিংহোমের চিকিৎসকেরা। সোমবার মুম্বাই থেকে অভিনেতা অমিতাভ জানতে চাইলেন, কেমন আছেন সৌমিত্র?
পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান বরাবরই রয়েছে এই দুই কিংবদন্তি অভিনেতার। শেষবার ২৪তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবের মঞ্চে একসঙ্গে দেখা গিয়েছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও অমিতাভ বচ্চনকে।

কিছুদিন আগে নিজেই করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করে ফিরেছেন অমিতাভ। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে এখন তিনি পুরোপুরি সুস্থ। সোমবার নিয়মিত চেকআপের জন্য নানাবতী হাসপাতালে গিয়েছিলেন। সেখানেই নিজের চিকিত্সকদের কাছ থেকে পশ্চিমবাংলার অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের শারীরিক পরিস্থিতি জানতে চান অমিতাভ।

এরপরই নানাবতী হাসপাতাল যোগাযোগ করে কলকাতার বেলেভিউ নার্সিং হোমের সঙ্গে। একপর্যায়ে নিজেই কথা বলেন অমিতাভ। জানতে চান, সৌমিত্রবাবু কেমন আছেন? বিভিন্ন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সে খবরটি জানিয়েছে সবাইকে।

বর্ষীয়ান অভিনেতার চিকিৎসা–সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয় অমিতাভকে। জানানো হয়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের এনসেফ্যালোপ্যাথি নিয়ন্ত্রণের জন্য কীভাবে কাজ করছেন চিকিৎসকেরা। তাঁর জ্বর নেই, রাতে ঘুমও হচ্ছে। তাঁর দিকে নজর রাখছেন ১৯ জন চিকিৎসক। এর মধ্যে হাসপাতালের ১১ জন, বাইরে থেকে আনা হয়েছে আরও ৮ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।চিকিৎসকেরা বলেছেন, রোববার থেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ওষুধের মাত্রা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। খাচ্ছেন রাইলস টিউব দিয়ে। দুই ঘণ্টা অন্তর খাওয়ানো হচ্ছে। এখন একটু একটু কথাও বলছেন তিনি।

শুনছেন রবীন্দ্রসংগীত আর তাঁর প্রিয় ছবির গানগুলো। চিকিৎসকেরা বলেছেন, এখন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সাড়াও দিচ্ছেন। মেয়ে পৌলমীকে বলেছেন, তিনি যেন বাবার সঙ্গে ভিডিও কলে অতীতের সুন্দর মুহূর্তগুলোর কথা শোনান। এখন তিনি কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই শ্বাস নিতে পারছেন।

গল্পের বই থেকে গল্প শোনানো হচ্ছে তাঁকে। চিকিৎসকেরা আশাবাদী, তিনি শিগগিরই সুস্থ হয়ে উঠবেন। ১ অক্টোবর থেকে বাড়িতে থাকাকালে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। জ্বরে পড়েন। তবে করোনার কোনো উপসর্গ দেখা যায়নি।

এরপরই চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁর করোনার নমুনা পরীক্ষা করা হলে ৫ অক্টোবর তাঁর কোভিড–১৯ পজিটিভ রিপোর্ট আসে। ৬ অক্টোবর তাঁকে ভর্তি করা হয় বেলভিউতে। এখানে সর্বশেষ ১৪ অক্টোবর তাঁর করোনার নমুনা পরীক্ষায় নেগেটিভ রিপোর্ট আসে। এরপরই সৌমিত্র সুস্থ হতে থাকেন। যদিও তাঁর করোনা ছাড়া অন্যান্য রোগ ছিল। এর মধ্যে রয়েছে প্রোস্টেট ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস।অভিনয়, কবিতাচর্চা, রবীন্দ্রপাঠ, সম্পাদনা, নাট্যসংগঠন—সব মিলিয়ে অনন্য সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বয়স ৮৫ বছর। ১৯৩৫ সালের ১৯ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় জন্ম তাঁর।

কলকাতা সিটি কলেজে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে সৌমিত্র ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেন। কলেজের ফাইনাল ইয়ারে হঠাৎ একদিন মঞ্চে শিশির ভাদুড়ীর নাটক দেখার সুযোগ হয় তাঁর। সেদিনই জীবনের মোড় ঘুরে যায়। নাটকে মনোনিবেশ করেন তিনি।

সৌমিত্র অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে ‘অশনিসংকেত’, ‘সোনার কেল্লা’,‘ দেবদাস’, ‘নৌকাডুবি’, ‘গণদেবতা’, ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘আতঙ্ক’, ‘গণশত্রু’, ‘সাত পাকে বাঁধা’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘তিন কন্যা’, ‘আগুন’, ‘শাস্তি’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ প্রভৃতি।অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন সৌমিত্র। ২০০৪ সালে তাঁকে পদ্মভূষণে সম্মানিত করা হয়। এ ছাড়া জাতীয় পুরস্কার, দাদাসাহেব ফালকেসহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি আবৃত্তি, রবীন্দ্রপাঠ, সম্পাদনা, নাট্যসংগঠন করেছেন তিনি। ১৯৬০ সালে সৌমিত্র বিয়ে করেন দীপা চট্টোপাধ্যায়কে। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ে পৌলমী চট্টোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত নাট্যব্যক্তিত্ব।








Leave a reply