করোনাকালে মিরপুরে ৯৮ নতুন প্রাণ

|

করোনার কারণে সেই মার্চ থেকেই বন্ধ রাজধানীর বিনোদন কেন্দ্রগুলো- যে তালিকায় রয়েছে মিরপুরের বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানাও। ঢাকা শহরের সুপরিচিত বিনোদন স্থানের মধ্যে এই চিড়িয়াখানা রয়েছে প্রথম সারিতেই। ২১৩ দশমিক ৪১ একর জমির ওপর তৈরি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম এই সুবিশাল চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসতেন প্রতিদিন ১০ হাজারেরও বেশি দর্শক। আর ঈদের সময় এই সংখ্যা পৌঁছাত লাখের কাছাকাছি। অথচ সেই চিড়িয়াখানা এখন পড়ে আছে সুনসান।

অবশেষে দীর্ঘদিনের নিস্তব্ধতা ভেঙে চিড়িয়াখানার দরজা খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। যারা পশুপাখি দেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তাদের জন্য নতুন সাজে বিন্যস্ত করা হচ্ছে এই মিরপুরের চিড়িয়াখানা। তারা দেখবেন করোনাকালে অনুকূল নির্জন পরিবেশে বাড়তি অক্সিজেন পেয়ে পশুপাখিদের মনেও প্রাণের সঞ্চার হয়েছে নতুন করে। চিড়িয়াখানায় এখন পাখির কলতান। নিরিবিলি পরিবেশে নাচছে ময়ূর, ঘুরছে হরিণ, হাতি, গন্ডারসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্যজন্তু। ভেসে আসছে বনমোরগের আওয়াজ, প্যাঁচার ডাক, প্রাণীদের চিৎকার। গাছে গাছে সবুজ পাতা। সন্ধ্যা হতে না হতেই ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। লেকের ওপর দিয়ে হামেশাই উড়াল দিচ্ছে মাছরাঙা, বকসহ বহু অচেনা পাখি।

চিড়িয়াখানার আলোকচিত্রী সারোয়ার রনি সমকালকে বলেন, ‘আগের তুলনায় বাইরে থেকে আসা পাখির সংখ্যা বেড়েছে এখানে। মানুষের কোলাহল না থাকায় বেজায় খুশি পশুপাখিরা। গাছেও ফুটেছে প্রচুর ফুল।’

শুধু কী তাই? চিড়িয়াখানার খাঁচায়ও এসেছে নতুন অতিথি। এরই মধ্যে জন্ম নিয়েছে ৯৮টি প্রাণী। গত ছয় মাসে ইমু পাখি নতুন ১২টি বাচ্চা জন্ম দিয়েছে। ময়ূরের সংসারেও এসেছে নতুন অতিথি। ২৩টি ময়ূর জন্ম নিয়েছে। এ ছাড়া ওয়াইল্ড বিস্ট, গাধা, জিরাফের ঘরেও এসেছে একটি করে নতুন অতিথি। একটি জিরাফের জন্ম লকডাউনের শুরুতেই। তাই সদ্যোজাত এই জিরাফের নাম দেওয়া হয়েছে দুর্জয়। সবচেয়ে বেশি নতুন অতিথি এসেছে হরিণের সংসারে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ১৫টি হরিণ জন্মেছে। এ ছাড়া গত পাঁচ মাসে একটি ইম্পালা, একটি গাধা, ৩০টি বক, পাঁচটি ঘুঘু ও ১০টি কবুতর জন্ম নিয়েছে বলে জানালেন চিড়িয়াখানার তথ্য কর্মকর্তা ডা. মো. ওয়ালিউর রহমান।

চিড়িয়াখানার ভারপ্রাপ্ত কিউরেটর মো. মাহফুজুল হক সমকালকে বলেন, যেসব প্রাণী খুব কম বাচ্চা দেয়, তারাও করোনাকালীন বাচ্চা দিয়েছে। ঠিকমতো খাবার পাওয়ার পাশাপাশি কোলাহলহীন পরিবেশ থাকায় প্রাণীগুলো প্রজনন কাজও করতে পারছে সঠিকভাবে। এ জন্যই এ সময়ে প্রাণীদের বাচ্চা জন্ম দেওয়ার সংখ্যাও বেড়েছে।

টানা ছয় মাসেরও বেশি সময় পর চিড়িয়াখানা খুলে দেওয়ার প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা চিড়িয়াখানা খোলার সুপারিশ জানিয়ে একটি চিঠি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এরপর মন্ত্রণালয় আমাদের কাছে বিশ্বের অন্যান্য চিড়িয়াখানার অবস্থা, করোনার পর তারা কীভাবে খুলেছে ও তাদের প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চেয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।’

তবে বন্ধের মধ্যেই চিড়িয়াখানাকে নতুন করে সাজানো হচ্ছে। চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসা শিশুদের খেলাধুলার জন্য বিভিন্ন খেলনার সমাহার ঘটিয়ে একটি পার্ক তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের। এর কাজ শুরুও হয়েছিল। যদিও পরে বরাদ্দের অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া চিড়িয়াখানার উত্তরের লেকের দুই স্থানে প্রায় ১৫ ফুট উঁচুতে দুটি সেলফি প্লাজা নির্মাণ করা হয়েছে। এ প্লাজার চারপাশে লেকের অথৈ জলরাশি দেখে সবাই মুগ্ধ হবেন। একেকটি প্লাজার ওপরে একসঙ্গে দেড়শতাধিক দর্শনার্থী দাঁড়াতে পারবেন। এখান থেকে সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য দেখা যাবে।

একটু দূর থেকে এ স্থানটি দেখলে মনে হবে জাহাজ। প্লাজার ওপর দাঁড়ালেই বাতাস শিহরণ জাগাবে। চিড়িয়াখানার ভেতরের সড়ক সংস্কার ও বিভিন্ন কালভার্টে রং দেওয়ায় চলাচলও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে চিড়িয়াখানার উদ্যোগে কয়েকশ’ গাছ রোপণ করা হয়েছে। লেকে মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে। গেইট, পার্কিং এবং দর্শনার্থীদের জন্য টয়লেটও তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত কিউরেটর মো. মাহফুজুল হক।








Leave a reply