দক্ষ কর্মী ভিসা ফি বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারত; অভিবাসন নীতির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা
ওয়াশিংটন: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নির্বাহী আদেশ দক্ষ কর্মী ভিসার (এইচ-১বি) ওপর বার্ষিক ১ লাখ ডলার ফি আরোপ করে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গতকাল শুক্রবার স্বাক্ষরিত এই আড়ম্বরপূর্ণ সিদ্ধান্ত মূলত কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারত, যার বৃহৎ সংখ্যক দক্ষ কর্মী যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে কর্মরত। এই পদক্ষেপের বৈধতা এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
এইচ-১বি ভিসার চিত্রকল্প: ভারত ও চীনের আধিপত্য
মার্কিন সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচির প্রধান সুবিধাভোগী দেশ হচ্ছে ভারত। ২০২৪ সালে, মোট এইচ-১বি ভিসার প্রায় ৭১ শতাংশ ভারতীয় নাগরিকেরা গ্রহণ করেছেন। ভারতের ঠিক পরেই রয়েছে চীন, যদিও সংখ্যার দিক থেকে তারা ভারতের চেয়ে বেশ খানিকটা পিছিয়ে; চীনা নাগরিকদের জন্য অনুমোদিত হয়েছে প্রায় ১১.৭ শতাংশ ভিসা। এই তথ্যগুলি ট্রাম্পের নতুন নীতির প্রভাব অনুধাবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন অ্যামাজন ডটকম এবং এর ক্লাউড কম্পিউটিং ইউনিট এডব্লিউএস, ১২ হাজারেরও বেশি এইচ-১বি ভিসা অনুমোদন পেয়েছে। একই সময়ে, মাইক্রোসফট ও মেটা প্ল্যাটফর্মের মতো সংস্থাগুলোও পাঁচ হাজারেরও বেশি ভিসা অনুমোদনের ছাড়পত্র লাভ করেছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব: প্রযুক্তি খাতে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক অবশ্য দাবি করেছেন যে, "সব বড় বড় প্রতিষ্ঠানই এইচ-১বি ভিসার জন্য বছরে ১ লাখ ডলার ফি দেওয়ার এই সিদ্ধান্তে সমর্থন দিয়েছে।" তিনি আরও বলেন, "আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলেছি।" তবে, রয়টার্সের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি বৃহৎ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও, তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি অথবা দ্রুত কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি, যা এই পদক্ষেপের সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়।
চাকরির বাজারে ইতিমধ্যেই এর প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান কগনিজ্যান্ট টেকনোলজি সলিউশনস করপোরেশনের শেয়ারের মূল্য প্রায় ৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এটি লক্ষণীয়, কারণ এই তথ্যপ্রযুক্তি পরামর্শ ও আইটি সেবাদানকারী সংস্থাটি ব্যাপকভাবে এইচ-১বি ভিসাধারী কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়াও, যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্ত ভারতীয় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ইনফোসিস ও উইপ্রোর শেয়ারের দামও ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে গেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির মতে, ট্রাম্পের এই নীতি ভারতীয় নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রাপ্তি আরও কঠিন করে তুলবে। গ্রিনকার্ডের জন্য আবেদন করা ভারতীয় নাগরিকদের দীর্ঘ অপেক্ষার সময়সীমার মধ্যে বারবার ভিসা নবায়ন করতে হয়, যা এখন ১ লাখ মার্কিন ডলারের অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা চাপাবে।
আইনি প্রশ্ন ও অভিবাসন নীতির ভবিষ্যৎ
আমেরিকান ইমিগ্রেশন কাউন্সিলের নীতিনির্ধারণী পরিচালক অ্যারন রাইকলিন-মেলনিক এই নতুন ফির বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, "কেবল যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস দেশটির সরকারকে আবেদনপ্রক্রিয়ার খরচ হিসেবে ফি নির্ধারণের অনুমতি দিতে পারে।" এই আইনি চ্যালেঞ্জ ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এক নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
সাধারণত, প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র ৬৫ হাজার এইচ-১বি ভিসা মঞ্জুর করে, যার মাধ্যমে বিশেষায়িত ক্ষেত্রে অস্থায়ীভাবে বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ করা হয়। এর বাইরে, উচ্চতর ডিগ্রিধারী কর্মীদের জন্য আরও ২০ হাজার ভিসা বরাদ্দ থাকে। বর্তমান নিয়মে, ভিসা আবেদনের জন্য তুলনামূলকভাবে কম ফি দিতে হয় এবং অনুমোদন পাওয়ার পর কর্মীদের আনার জন্য কয়েক হাজার ডলার ফি প্রয়োজন হয়, যা প্রায়শই নিয়োগকর্তারাই বহন করেন। সাধারণত এই ভিসা তিন থেকে ছয় বছরের জন্য দেওয়া হয়।
এই কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি, ট্রাম্প আরও একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন যেখানে ১০ লাখ ডলারের বিনিময়ে স্থায়ী বসবাসের জন্য 'গোল্ড কার্ড' চালুর কথা বলা হয়েছে। এই ধরনের নীতিগুলি ইঙ্গিত দেয় যে ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন ব্যবস্থাকে একটি সম্পূর্ণ নতুন পথে চালিত করতে আগ্রহী, যেখানে দক্ষ কর্মীদের প্রবেশাধিকারকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তবে, এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, এবং চীনের অর্থনীতিতে কেমন হবে, তা সময়ই বলে দেবে।