একদিনের ক্রিকেটে দ্বিশতকের কাছে গিয়েও ফিরতে হয়েছে অনেক কিংবদন্তিকে; এর নেপথ্যে সৌরভ গাঙ্গুলীর রহস্যময় ভূমিকা
ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় শচীন টেন্ডুলকারের অবিস্মরণীয় দ্বিশতক এক সোনালী অধ্যায়। কিন্তু শচীন এই রেকর্ড গড়ার আগেই একদিনের আন্তর্জাতিক (ওডিআই) ক্রিকেটে বেশ কিছু বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যান দ্বিশতকের দোরগোড়ায় পৌঁছেও রহস্যজনকভাবে থেমে গেছেন। এই 'প্রায় হয়ে যাওয়া'র তালিকায় বারবার এক 'এক্স-ফ্যাক্টর' হিসেবে উঠে এসেছে ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলীর নাম। এই ঘটনাপ্রবাহ কি নিছকই কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে রয়েছে সৌরভের এক বিশেষ প্রভাব?
দ্বিশতকের হাতছানি, তবু অধরা
যেসব ব্যাটসম্যান শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকে পুরো ৫০ ওভার খেলেও দ্বিশতক ছুঁতে পারেননি (যেমন ভিভ রিচার্ডসের ১৮৯*, গ্যারি কারস্টেন এর ১৮৮*, বা চার্লস কভেন্ট্রির ১৯৪*), তাদের বাদ দিলেও দেখা যায়, অনেক তারকা ক্রিকেটার অল্প কিছু রানের জন্য আউট হয়েছেন, যখন তখনও বেশ কিছু ওভার বাকি ছিল। তাদের ইনিংস পূর্ণ হলে নিশ্চিতভাবেই তারা দ্বিশতক পূরণ করতে পারতেন।
ভিভ রিচার্ডসের অপ্রতিরোধ্য ১৮১
১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ভিভ রিচার্ডস ১৮১ রানের একটি অসাধারণ ইনিংস উপহার দেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সেদিন ৫০ ওভারে ৩৬০/৪ রান করে। রিচার্ডস যখন আউট হন, দলের রান তখন ৩৪৩। যদিও তিনি শেষ পর্যন্ত থাকতে পারেননি, ধারণা করা হয়, পুরো ওভার খেললে হয়তো সামান্য কিছু রানের জন্য তার দ্বিশতক হাতছাড়া হতো। তবে তার এই ইনিংসটি সময়ের তুলনায় ছিল অনেক আধুনিক।
সাঈদ আনোয়ারের ১৯৪: শচীন-সৌরভের যুগলবন্দী
১৯৯৭ সালে ভারতের বিপক্ষে ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপে পাকিস্তানের সাঈদ আনোয়ারের ১৯৪ রানের ইনিংসটি এখনও ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে উজ্জ্বল। তিনি যখন আউট হন, তখনও পাকিস্তানের তিন ওভারের বেশি খেলা বাকি ছিল। তার ইনিংসটি অনায়াসেই দ্বিশতকে রূপ নিতে পারত। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! আনোয়ার আউট হয়েছিলেন স্বয়ং শচীন টেন্ডুলকারের বলে! আর সেই মুহূর্তে 'এক্স-ফ্যাক্টর' হিসেবে সৌরভ গাঙ্গুলী অবিশ্বাস্য একটি ক্যাচ ধরেছিলেন শর্ট ফাইন লেগ থেকে পিছনের দিকে দৌড়ে। সেই ক্যাচ ধরতে গিয়ে সৌরভের মাথায় সামান্য আঘাতও লেগেছিল। এভাবেই শচীন-সৌরভের যৌথ প্রয়াসে আটকে গিয়েছিল আনোয়ারের ঐতিহাসিক দ্বিশতক।
সৌরভের নিজের ১৮৩: 'দাদা'র দ্বিশতকও অধরা
আশ্চর্যের বিষয়, শুধু অন্যের দ্বিশতক আটকাতেই নয়, সৌরভ গাঙ্গুলী নিজেও ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টনটনে ১৮৩ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস খেলেছিলেন। ভারতীয় ইনিংসের ঠিক আগের বলেই তিনি আউট হন। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, আর অল্প কিছু স্ট্রাইক পেলেই সৌরভ নিজেও সেই দিন দ্বিশতক হাঁকাতে পারতেন। যেন এক অজানা নিয়তি তাকেও এই মাইলফলক থেকে বঞ্চিত করেছিল।
জয়াসুরিয়ার ১৮৯: ফের সৌরভের 'ভূমিকা'
২০০০ সালে শারজায় ভারতের বিপক্ষে শ্রীলঙ্কার সনাথ জয়াসুরিয়া ১৮৯ রানের এক বিস্ফোরক ইনিংস খেলেন। জয়াসুরিয়া ৪৮.১ ওভারে আউট হন। অর্থাৎ, তিনিও পুরো ৫০ ওভার খেললে সহজেই দ্বিশতক পূর্ণ করতে পারতেন। এবারও চমকপ্রদভাবে জয়াসুরিয়া আউট হয়েছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলীর বলেই, যা বিজয় দাহিয়ার স্টাম্পিংয়ে সম্পন্ন হয়। সেদিন শ্রীলঙ্কা মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়ে ম্যাচ হারলেও, জয়াসুরিয়ার সেই ইনিংসটি ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা।
এক কাকতালীয় ধারাবাহিকতা?
এই ঘটনাপ্রবাহ নিছকই কাকতালীয় হতে পারে, তবে সৌরভ গাঙ্গুলীর বারবার এমন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে উপস্থিতির কারণে এটি ক্রিকেট মহলে এক আলোচনার বিষয়। শচীন টেন্ডুলকারের অবিস্মরণীয় দ্বিশতকের আগে যেসব ব্যাটসম্যান এই মাইলফলকের কাছাকাছি এসেছিলেন, তাদের অনেকের ক্ষেত্রেই সৌরভ গাঙ্গুলী ছিলেন একটি উল্লেখযোগ্য 'এক্স-ফ্যাক্টর' — কখনও দুর্দান্ত ক্যাচ ধরে, কখনও বোলার হিসেবে উইকেট নিয়ে। এই রহস্যময় 'দাদা ফ্যাক্টর' হয়তো কোনও পরিসংখ্যানের হিসাবে মেলে না, কিন্তু ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে এটি চিরকাল কৌতূহল জাগিয়ে রাখবে।