রাশিয়া যে পদ্ধতিতে ইউক্রেন জিততে চান

|

ইউক্রেনের যুদ্ধ মূলত রাশিয়া এবং পশ্চিমের ইচ্ছাশক্তি ও ক্ষমতার লড়াই। এই লড়াইয়ে মনে রাখা দরকার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কোনও যুদ্ধে হারেননি। চেচনিয়া, জর্জিয়া, সিরিয়া, ক্রিমিয়া– দুই দশক ক্ষমতায় থাকার মধ্যে যত যুদ্ধে জড়িয়েছেন, সবগুলোতে জয়ী হয়েছেন পুতিন। সেনাবাহিনীকে তিনি এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেন যাতে রুশ জনগণের চোখে ও উৎসুক বিশ্ববাসীর সামনে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তাদের বিজয়ী ঘোষণা করা যায়। ইউক্রেনেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা কম।

পশ্চিমা হুমকি উপেক্ষা করে ২৪ ফেব্রুয়ারি সূর্যোদয়ের আগে ইউক্রেনে হামলা শুরু করে রুশ বাহিনী। গত কয়েক দশকের মধ্যে ইউরোপের মাটিতে প্রথম এই স্থলযুদ্ধে হতবাক হয়েছে ইউক্রেনসহ বিশ্বের বহু নাগরিক। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই যুদ্ধ পুরো ইউক্রেনে ছড়িয়ে পড়ে। রুশ ট্যাংক দ্রুত কিয়েভ অভিমুখে চলতে শুরু করে।

ইউক্রেনে আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে পুতিন শীতল যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের ইউরোপের নিরাপত্তা শৃঙ্খলা ভেঙে দিয়েছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কিয়েভের পতনের পর সামরিক আগ্রাসন রাজনৈতিক মীমাংসায় মোড় নেবে। কিয়েভে বসানো হবে রুশপন্থী সরকার।

ইউক্রেন ন্যাটো জোটের সদস্য নয়। একদিন তারা সদস্য হবে– এমন আশঙ্কাই বর্তমান যুদ্ধের অন্যতম কারণ। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই হামলার মধ্য দিয়ে ইউক্রেনের ন্যাটো জোটের সদস্য হওয়ার আকাঙ্ক্ষার চিরতরে মৃত্যু ঘটেছে।

স্পটলাইটে ‘নতুন জার’

মস্কোভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক জার্নাল রাশিয়া ইন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর এডিটর ইন চিফ ফিয়োদোর লুকিয়ানোভ জানান, সোভিয়েত পরবর্তী সময়ে পূর্ব ইউরোপের স্থিতাবস্থা কোনোদিনই মেনে নেননি পুতিন। তিনি বলেন, ‘এই ভাবনা তাকে গিলে ফেলেছে। তিনি বিশ্বাস করেন, সোভিয়েত পতনের পর থেকে রাশিয়াকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বলে বিবেচনা করে পশ্চিমারা।

এখন পশ্চিমা কূটনীতিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন, পুতিন কিয়েভে ভলোদিমির জেলেনস্কির নেতৃত্বাধীন পশ্চিমপন্থী সরকারের পতন ঘটিয়ে সেখানে নতুন সরকার বসাবে, যিনি হবেন ‘নতুন জার’-এর অনুগত। এস্তোনিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট টোমাস ইলভস পুতিনকে এই নামেই (নতুন জার) ডেকে থাকেন। আর মার্কিন গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, কয়েক দিনের মধ্যেই এমনটি ঘটে যেতে পারে।

বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনে পুতিন নিজেও চান না বা প্রয়োজনও নেই পুরো ইউক্রেন দখলের। টোমাস ইলভস-এর মতে, ‘তিনি বেলারুশের মতো একটি পুতুল সরকার চান। এরপর রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যকার নিরাপত্তা সমঝোতা নতুন করে প্রণয়ন করতে চান পুতিন।’

ইউক্রেনের নেতৃত্বও এমনটাই মনে করেন। দেশটির প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফের উপদেষ্টা মিখাইলো পোডোলিয়াক বলেন, ‘ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় বিশ্বাস করে রাশিয়ার দুটি কৌশলগত লক্ষ্য রয়েছে — এলাকা দখল ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দিতে ইউক্রেনের বৈধ রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর আক্রমণ এবং একটি অনুগত সরকার বসানো যারা রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক একটি শান্তি চুক্তি সই করবে।’

আরও পড়ুন……যে কারণে ব্রিজসহ নিজেকে উড়িয়ে দিলেন ইউক্রেনীয় সেনারাশিয়া যে পদ্ধতিতে ইউক্রেন জিততে চান

মিশন সফল

চীনকে নজরে রেখে এশিয়ায় দৃষ্টি ফেলেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তাদের নজর এবার পূর্ব ইউরোপে ফিরিয়ে নিয়েছে রাশিয়া। সোভিয়েত আমলের প্রত্যেক নেতাই যেমনটা করেছেন তেমনি পুতিন এখন বিশ্বের মনোযোগ তার দিকে টেনে নিয়েছেন। সামরিক ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে রাশিয়াকে প্রতিদ্বন্দ্বিহীন পরাশক্তি বানাতে মরিয়া তিনি, তার চাওয়া রাশিয়া সব সময় বিশ্বের নেতৃত্ব দেবে।

‘আর শ্রদ্ধার সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে না পারলে ভীতি দেখিয়ে নেতৃত্ব দেওয়া হবে’, বলেন রাশিয়া ইন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর এডিটর ইন চিফ ফিয়োদোর লুকিয়ানোভ।

ইউক্রেনে হামলার নির্দেশের পর যেমনটি হুমকি দিয়েছেন পুতিন। বলেছেন, সোভিয়েত ভেঙে গেলেও, আজকের রাশিয়া সবচেয়ে বড় নিউক্লিয়ার অস্ত্রসমৃদ্ধ দেশ। 

পুতিন আরও বলেন, ‘এছাড়া রাশিয়ার আরও কিছু অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র আছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, আমাদের দেশের প্রতি সম্ভাব্য যেকোনও হামলাকারী নিশ্চিত পরাজিত হবে। এমন পরিণতি হবে যা ইতিহাসে কারও হয়নি।’

পশ্চিমা প্রতিক্রিয়া

আগ্রাসনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা রাশিয়ার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তবে এই নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হবে তা স্পষ্ট নয়। পুতিন নিজে বিশ্বাস করেন, তিনি রাশিয়াকে এমনভাবে গড়ে তুলেছেন যাতে কোনও নিষেধাজ্ঞাই কার্যকর হবে না। রাশিয়ার কাছে ৬৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি নগদ অর্থ মজুত রয়েছে। আর প্রতিমাসে তেল ও গ্যাস রফতানি করে আরও ১৪ বিলিয়ন ডলার তাতে যোগ করেন। সুইডেনে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত ভিক্টর টাটারিনেস্তভ এক সাক্ষাৎকারে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে বলেছেন, ‘ভাষার জন্য ক্ষমা করবেন, কিন্তু আপনাদের নিষেধাজ্ঞায় আমরা মলত্যাগও করি না।’

ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন শুরুর দিনেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আশা প্রকাশ করেছিলেন ‘গণঅসহযোগ’ ও কৌশলগতভাবে রুশবাহিনীকে খাদের কিনারে নিয়ে যেতে পারলেই দখলদারীর অবসান ঘটাবো সম্ভব। তবে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে বাইডেনের মতো আশাবাদী নন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘কিয়েভের সরকারের পতনের পর, ইউক্রেনে সামরিকভাবে সমর্থন দেওয়ার মতো কোনও বিরোধী থাকবে না।’

ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তার ধারণার ভিত্তিও রয়েছে। ২০ বছর আগে চেচনিয়ার বিদ্রোহ নৃশংসভাবে থামানো হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘বিরোধিতার প্রবল চাপ তৈরির চিন্তা বাস্তব সম্মত নয়। স্বাধীন বিশ্বের মতো পুতিন মানুষের জীবনের মূল্য দেন না, সেকারণে রুশ বাহিনী যেকোনও বিরোধিতা নির্মূল করে দেবে।’

এমনকি পুতিনেরও বিরোধিতা দমনে নৃশংসতা ব্যবহারের নজির রয়েছে। চেচনিয়ায় মুসলিম বিদ্রোহ দমন ছাড়াও ২০০৮ সালে জর্জিয়াতেও একই পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি। ২০১৪ সালে ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া দখল করে দেশটির পূর্বাঞ্চলের দুই এলাকা ডনেস্ক এবং লুহানস্কে বিচ্ছিন্নতাবাদে মদত দিয়েছেন পুতিন।

আর সিরিয়ার জটিল যুদ্ধক্ষেত্রেও রাশিয়ার সমর্থনে প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদ শত্রুদের ওপর বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করেছেন। আসাদের ক্ষমতা সংহত রাখতে রুশ সেনা পাঠিয়েছেন তিনি। এখনও সেখানে ক্ষমতা ধরে রেখেছেন আসাদ।








Leave a reply