কিভাবে প্রচলন হল জামাই ষষ্ঠীর?

|

জামাই ষষ্ঠী বাঙালির কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় উৎসব। নানা নিয়ম-আচারের মাধ্যমে জামাই ষষ্ঠী পালন করেন শাশুড়িরা। জামাই ও মেয়ের মঙ্গলকামনায় এই ব্রত পালন করা হয়। জামাই ষষ্ঠী একটি লোকায়ত প্রথা। ষষ্ঠীদেবীর পার্বণ থেকে এই প্রথার উদ্ভব। বৈদিক যুগ থেকেই জামাইষষ্ঠী পালন হয়ে আসছে। প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ মাসের ষষ্ঠী তিথিতে প্রথম প্রহরে ষষ্ঠী পুজার আয়োজন করা হয়। ষষ্ঠীর প্রতিমা কিংবা আঁকা ছবিতে পুজো করা হয়। কেউ কেউ ঘট স্থাপন করেও এই পুজো করে থাকেন।

কথিত রয়েছে, এক ব্রাহ্মণের ঘরে তাঁর তিন ছেলে ও তাঁদের তিন বউ থাকতেন। তাঁদের একটি পোষা বিড়াল ছিলো। তিন বউয়ের মধ্যে ছোট বউ প্রায়ই খাবার চুরি করে খেতেন আর দোষ চাপাতেন পোষা বিড়ালটার ওপর। বিড়ালটা ছিল মা ষষ্ঠীর বাহন। সে মা ষষ্ঠীর কাছে ছোট বউয়ের নামে নালিশ করত। এইরকম ভাবেই একদিন জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতে ব্রাহ্মণী ব্রত পালনের জন্য পায়েস, মিষ্টি রান্না করেছিলেন। তিনি স্নানে যাবার আগে ছোট বউকে খাবারগুলো দেখতে বলে গেলেন, দেখো তো মা! বেড়ালটা যেন কিছুতে মুখ না দেয়।

ব্রাহ্মণী স্নানে গেলে খাবারগুলো দেখে ছোটবউ লোভ সামলাতে পারলেন না। সব খাবার থেকেই একটু একটু করে নিয়ে খেয়ে দেখলেন। আর দই নিয়ে বিড়ালটার মুখে লাগিয়ে দিয়ে এলেন। এরপর স্নান করে এসে ব্রাহ্মণী খাবারের এরম অবস্থা দেখে ছোট বউকে জিজ্ঞেস করলেন এরম কে করেছে! ছোটবউ বললেন, কি জানি মা! আমার একটু চোখ লেগে গেছিল। মনে হয় বিড়ালটাই খেয়েছে।

এই বলে ছোট বউ বেড়ালটাকে নিয়ে এসে মাকে দেখালেন, এই দেখুন মা! মুখে খাবার লেগে আছে এখনও! বলে বেড়ালটাকে দু চার ঘা দিয়ে ছেড়ে দিলেন।  মনের দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে বিড়ালটা বনে গিয়ে মা ষষ্ঠীর কাছে সব কথা বলল। মা ষষ্ঠী বললেন, আমি সব জানি। তুই কাঁদিস না! আমি ওকে শীঘ্রই এর প্রতিদান দেব।

কয়েকমাস পর ছোটবউ সন্তানসম্ভবা হলেন। তাঁর একটি ফুটফুটে ছেলে জন্মাল। বাড়ির সকলে তো বিশাল খুশি। ব্রাহ্মণী গরিবদের বস্ত্র বিতরণ করলেন। একদিন রাতে ছেলেকে কোলে নিয়ে শুয়েছিলেন ছোটবউ। পরের দিন ঘুম ভেঙে দেখলেন ছেলে তাঁর কাছে নেই। অনেক খুঁজেও কোথাও ছেলেকে পাওয়া গেল না। এইভাবে ছোট বউ সাত সাতটি সন্তানের জন্ম দিলেন, কিন্তু একইভাবে সকলেই নিখোঁজ হয়ে যায়। রাতে কোলে নিয়ে তিনি শুতেন আর সকালে উঠেই কাউকে খুঁজে পেতেন না। তখন পাড়ার লোকেরা বলতো, এই বউ নিশ্চয়ই রাক্ষসী। নিজের ছেলেমেয়ে খেয়ে ফেলে। একে ঘরছাড়া করা উচিত। এই কথা শুনে মনের কষ্টে ছোটবউ বনে চলে গেলেন।

বনে গিয়ে ষষ্ঠী দেবীর আরাধনা শুরু করেন তিনি। তাঁর আরাধনায় মা ষষ্ঠী তুষ্ট হন। এক বুড়ির ছদ্মবেশে এসে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে? কাঁদছিস কেন? তখন ছোট বউ তাঁর দুঃখের কথা জানালেন। তখন বুড়ি বললেন, নিজের দুঃখের কথা তো বললি কিন্তু ছেলেপুলে হওয়ার আগে যে তুই খাবার চুরি করে তোদের বিড়ালের নামে দোষ দিতিস সেটা তো বললি না!

এটা শুনে ছোট বউ বুড়ির পায়ের ওপর লুটিয়ে পড়লেন, তুমি কে মা! আমার এত কথা জানলে কি করে! মা ষষ্ঠী নিজের পরিচয় দিলেন। তখন ছোট বউ আরও জোরে তাঁর পা জড়িয়ে ধরে বললেন, আমি অনেক ভুল করেছি মা। আমায় ক্ষমা করুন। আপনি যা বলবেন তাই করব।

তখন মা ষষ্ঠী তাঁকে বললেন, পথের ধারে একটা মরা বিড়াল পচে পড়ে আছে। তুই এক হাঁড়ি দই নিয়ে ওর গায়ে ঢেলে চেটে আবার সেই দই হাঁড়িতে তুলতে পারলে তোর ছেলেমেয়েরা ফিরে আসবে। ছোট বউ তাই করলেন। তখন মা ষষ্ঠী তাঁর ছেলেমেয়েদের ফিরিয়ে দিলেন। এ জন্যেই ষষ্ঠীদেবীর অপর নাম অরণ্য ষষ্ঠী। ষষ্ঠী দেবী তখন ছোট বউকে বললেন, এই দইয়ের ফোঁটা এদের কপালে দে। আর কখনও পুজোর জিনিস চুরি করে আমার বাহনের নামে দোষ দিবি না। আর ছেলেমেয়েকে কখনও ‘দূর হ! মরে যা’ বলবি না।

এই বলে মা ষষ্ঠী অদৃশ্য হয়ে গেলেন। ছোটবউ ছেলেমেয়েদের নিয়ে ফিরে এলেন। ব্রাহ্মণী নাতি নাতনিদের পেয়ে খুব খুশি হলেন। সকলে মা ষষ্ঠীর পূজা করলেন। এরপর ছেলেমেয়েরা বড় হলে তাঁদের বিয়ে দিলেন। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতে মেয়ে জামাইকে ডেকে জামাই ষষ্ঠী করলেন। এ ভাবেই জামাই ষষ্ঠীর প্রচলন হয়।








Leave a reply