চুলের যত্নে প্রয়োজনীয় ৬ হারবাল উপাদান

|

চুল বা ত্বকের যত্নে প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহার কিছুটা সময়সাপেক্ষ হলেও কার্যত নিরাপদ। কারণ মানুষের দেহের প্রাকৃতিক উপাদানগুলো গ্রহণ করার জন্যই তৈরি। সে বিবেচনায় হারবাল উপাদান চুলের যত্নের জন্য সবচাইতে বেশি নিরাপদ। চুলের স্বাস্থ্য রক্ষায়, চুল পড়া কমাতে, নতুন চুল গজাতে এবং খুশকিসহ চুলের যাবতীয় সমস্যা দূর করতে কিছু কার্যকরী ভেষজ উদ্ভিদের গুণাগুণ অপরিহার্য।

চুল পড়া সমস্যা যাদের নিয়মিত, তারা সেরা ফল পেতে চুলে হারবাল উপাদান ব্যবহার করতে পারেন। ব্রাহ্মি, আমলা ও অ্যালোভেরার মতো প্রাকৃতিক উপাদান চুলে অতিরিক্ত পুষ্টি সরবরাহ করে নতুন চুল গজাতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে চুল পড়া নিয়ন্ত্রণ করে চুলকে রাখে মসৃণ। বাদাম থেকে পাওয়া দ্বিগুণ প্রাকৃতিক নির্যাস সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক ভিটামিন ‘ই’ যে কোনো সময়ের তুলনায় চুলে অতিরিক্ত পুষ্টি জুগিয়ে চুলকে করে শক্তিশালী, ঘন ও প্রাণবন্ত। চুলের জন্য এমনই কিছু হারবাল উপাদান ও তার উপকারিতা নিয়েই আজকের আয়োজন ‘চুলের যত্নে হারবাল উপাদান’।

ভেটিভার
তামিল শব্দ ‘ভেটেভার’ থেকে ভেটিভার কথাটি এসেছে– এটি একটি ঘাস। ভারতের স্থানীয় এই ভেটেভারের পাতা ও শিকড়ের দুর্দান্ত ভেষজ গুণাগুণ রয়েছে এর মধ্যে। এর প্রধান একটি বৈশিষ্ট্য হলো- শীতলীকরণের গুনাগুণ। ভেটিভারের নিয়মিত ব্যবহার মাথার স্নায়ুকে শীতল রাখতে সাহায্য করে, চুল ও স্ক্যাল্পকে সুস্থ রাখে এবং মাথা রাখে ঠাণ্ডা। এর শিকড়গুলো মূলত ঘরোয়া প্রতিকার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

মাথার ত্বকে উন্নত পুষ্টির সঙ্গে নিয়মিত ব্যবহারের ফলে ভেটিভার তেল চুলের ফলিকেলগুলোকে শক্তিশালী করে এবং চুলের সুস্থতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে চুল পড়া উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে।

মুকুনুওয়েন্না
মুকুনুওয়েন্না (অলটারনেথেরা স্যাসিলিস) স্যাসাইল জয়উইড হিসেবে পরিচিত। এটি ব্রাজিলের স্থানীয় এবং বিশ্বজুড়ে অনেক গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপনিবেশীয় অঞ্চলের একটি সাধারণ উদ্ভিদ। বেশ কিছু উপকারী বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি অতি অল্প সময়ের মধ্যে নতুন চুল গজানো আর চুলের দ্রুত বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মুকুনুওয়েন্না অত্যন্ত দক্ষ ভূমিকা রাখে।

অ্যালোভেরা
রুক্ষ ও শুকনো চুলের জন্য পুষ্টিকর উপাদান হিসেবে অ্যালোভেরা ব্যবহৃত হয়। এটি অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল। জৈব নারিকেল তেলের সঙ্গে অ্যালোভেরা জেল যুক্ত করে মাথার ত্বক এবং চুলে ব্যবহারে চুলের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়। অ্যান্টি-ড্যানড্রাফ নিরাময় হিসেবেও অ্যালোভেরার ব্যবহার হয়ে থাকে। মাথার ত্বকে উদ্ভিদের জেল অংশটি ঘষার ফলে খুশকি পরিষ্কার হয়। অ্যালোভেরা বিউটি পণ্যগুলোতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

অ্যালোভেরা চুলের প্রাকৃতিক কন্ডিশনার। চুলের যে কোনো অবস্থার জন্য অ্যালোভেরা ব্যবহার করা যায়। আপনার উজ্জ্বল, দুরন্ত চুলকে মসৃণ এবং নরম করে তুলতে অ্যালোভেরার জুড়ি নেই। ময়শ্চারাইজিং বৈশিষ্ট্যগুলোর পাশাপাশি অ্যালোভেরা চুল ভাঙা রোধ করে এবং মাথার ত্বকের প্রাকৃতিক তেলগুলো ধরে রাখে, যা ফ্রোজি ট্রেসের মতো কাজ করে। অ্যালোভেরার ব্যবহারে মাথার ত্বকের ফলিকেলের শক্তি বৃদ্ধি করে এবং এভাবে চুলের পুনঃবৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এটি প্রোটোলিটিক অ্যানজাইম, এর তামা এবং জিংকের মতো খনিজগুলো চুলের বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করে। ফলে স্বাস্থ্যকর এবং শক্তিশালী চুলের জন্য নিশ্চিন্তে অ্যালোভেরা ব্যবহার করা যায়।

আমলকী
আমলকী (বৈজ্ঞানিক নাম: Phyllanthus emblica) ফাইলান্থাসি পরিবারের ফাইলান্থুসগণের একপ্রকার ভেষজ ফল। ইংরেজি নাম ‘Aamla’ বা ‘Indian gooseberry’। এরা রোমশবিহীন বা রোমশ পর্ণমোচী বৃক্ষ। এটি ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে পারে।

চুল পড়ে যাওয়া দূর করতে আমলকী বেশ উপকারী। এর ভিটামিন সি চুলের গ্রন্থিকোষগুলোতে পুষ্টি জাগিয়ে কোলাজেন প্রোটিন উৎপাদন করে, যা চুলের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এই কোলাজেনগুলো চুলের মৃত কোষগুলোকে নতুন করে প্রতিস্থাপন করতে সহায়তা করে। একইভাবে আমলা তেলে থাকা ফাইটো-পুষ্টি, ভিটামিন এবং খনিজগুলো মাথার ত্বকে রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে, চুলের সুস্থ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। ভিটামিন ‘সি’র পাশাপাশি আমলা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলিতেও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এটি চুলের খুশকির সমস্যা দূর করে।

মোটামুটি সবাই জানে যে মূলত মাথার ত্বকের শুষ্কতার কারণে খুশকি হয়। আমলায় থাকা ভিটামিন ‘সি’ শুষ্কতার সমস্যা মোকাবেলা করে এবং আপনার মাথার ত্বকে খুশকি জমা রোধ করে। আমলাতে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি এবং অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্যও রয়েছে যা খুশকির কারণে চুলকানির থেকে মুক্তি দিতে সহায়তা করে। চুলকে ঝলমলে করার জন্য ঘরে তৈরি আমলা গুঁড়ো চুলে ব্যবহার করা হয়। আবার মাথায় মেহেদি দেয়ার সময় আরও ভালো রঙের জন্য কিছু আমলা গুঁড়ো মিশিয়ে নিলে ভালো ফল পাওয়া যায়। এটি চুলকে আরও উজ্জ্বল করার পাশাপাশি মেহেদির শক্তিকে বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে।

ব্রাহ্মি:
ব্রাহ্মি (ইংরেজি: herb of grace, Indian pennywort); (বৈজ্ঞানিক নাম: Bacopa monnieri) হচ্ছে প্লান্টাগিনাসি পরিবারের একটি উদ্ভিদ। এটি ছোট গাছ, এর কাণ্ড এবং পাতা রসালো হয়। চুলের যত্নে ব্রাহ্মির গুরুত্ব অপরিসীম।

জনপ্রিয় হারবাল উপাদান ব্রাহ্মি সাধারণত ‘ঐশ্বরিক ঔষধি’ হিসাবে পরিচিত। এটি চুলের ভেঙে যাওয়া প্রান্তগুলো ঠিক করে এবং পুনরায় ভাঙ্গা প্রতিরোধে সহায়তা করে, যা চুলের বৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি চুলের ফলিকালকে আরও শক্ত এবং মজবুত করতে সহায়তা করে। যারা চুল পড়া সমস্যা মোকাবেলা করছেন তাদের জন্য ব্রাহ্মি দুর্দান্ত সমাধান।

ব্রাহ্মি একটি প্রাকৃতিক কন্ডিশনার, যা চুলকে গোড়া থেকে রক্ষা করে। যাদের চুল পাতলা বা দুর্বল তাদের চুলের গোড়া শক্ত করার জন্য ব্রাহ্মির বিকল্প নেই। ব্রাহ্মির আরেকটি ওষধি গুণ হলো এটি অতিরিক্ত শুষ্ক মাথার ত্বকের খুশকি নিরাময়ে সহায়তা করে। এটি গুঁড়ো আকারে তেলের সঙ্গে ব্যবহারের ফলে আরও দুর্দান্ত ফল পাওয়া যায়। এ ছাড়া আরও নতুন বেশি চুল গজানোর জন্য যে কোনো চুলের প্যাকের সঙ্গে এটি একটি দুর্দান্ত সংযোজন। ব্রাহ্মি প্রাকৃতিক হওয়ায় সব ধরনের গ্রাহকদের জন্য ব্যবহারে উপযোগী।

বাদাম
বাদাম (প্রুনাস ডালকিস, সিন। প্রুনাস অ্যামিগডালাস) এমন এক প্রজাতির গাছ, যা ইরান ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে পাওয়া যায়; তবে অন্যত্রও ব্যাপকভাবে চাষ হয়।

বাদামে তুলনামূলকভাবে উচ্চ মাত্রায় ভিটামিন-ই থাকে, যাতে টোকোফেরলের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। বাদামের ফ্যাটি অ্যাসিড, ওমেগা ৩ এবং ওমেগা ৬ চুলের গোড়ায় প্রয়োজনীয় রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে চুলের বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে চুলকে স্বাস্থ্যকর করে। নিয়মিত ম্যাসাজ চুলকে সিল্কি করে, চুলের বৃদ্ধি নিশ্চিত করে এবং চুল ধূসর হওয়া রোধ করে। একই সঙ্গে বাদাম চুলকে শক্তিশালী, নরম এবং চকচকে করতেও সহায়তা করে।

নিয়মিত বাদাম সেবনে পলিঅনস্যাচুরেটেড এবং মনো ফ্যাটি অ্যাসিড সহ ভিটামিন এ, ডি, বি ১, বি ২ এবং বি ৬ এর মতো পুষ্টির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়; যা চুলের বৃদ্ধি বাড়িয়ে, খুশকি এবং প্রদাহ রোধের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখে। বাদামের তেল ফ্ল্যাশনেস হ্রাস করার জন্য মাথার ত্বক আর্দ্র রাখে, চুল নরম করে এবং বাদামে ম্যাগনেসিয়াম চুলের বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। এ ছাড়া বাদাম চুলের ফলিকলগুলোতে পর্যাপ্ত পুষ্টি সরবরাহ করে চুলের গোড়াকে শক্তিশালী করে তোলে, ফলে চুল পড়া কমে যায়।

ভেষজ উপাদান ব্যবহারের উপযোগিতা লিখে শেষ করা যাবে না। এসব প্রাকৃতিক ভেষজ উদ্ভিদ আপনার চুলের এবং স্কাল্পের কোন প্রকার ক্ষতি না করেই আপনার চুলের যাবতীয় সমস্যা দূর করতে সক্ষম। চুল পড়া, খুশকি, মাথাব্যথা, অনিদ্রা ইত্যাদি নানান সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম এই ভেষজ উদ্ভিদগুলো। হারবাল তেলে থাকা প্রোটিন, ভিটামিন-ই, ন্যাচারাল অ্যান্টি অক্সিডেন্টস চুলকে গোড়া থেকে নারিশ করে, চুলের গোড়াকে মজবুত করে তোলে, চুল পড়া কমায় এবং চুলকে করে তোলে সিল্কি, শাইনি আর গর্জিয়াস।

ক্ষতিকারক বিভিন্ন কেমিক্যালযুক্ত প্রোডাক্ট ব্বহার করার কারণে চুল যদি আপাতভাবে সুন্দর হয়ও, তবুও ভবিষ্যতে চুলের গোড়া নরম হওয়া, চুল পড়া, চুল রুক্ষ আর শুষ্ক হওয়া, মাঝখান থেকে ভেঙে পড়া এবং নিষ্প্রাণ দেখানোসহ আরো অনেক সমস্যা দেখা দেয়। সুন্দর এবং স্বাস্থ্যোজ্জ্বল চুল আপনার ব্যক্তিত্বই বদলে দিতে পারে। তাই চুলের যত্নে সবসময় হারবাল উপাদান বেছে নেয়া উচিত।








Leave a reply