হরিপ্রভা তাকেদা: ঢাকার প্রথম আধুনিক নারী

|

হরিপ্রভা তাকেদা- বিবেচিত হন ‘ঢাকার প্রথম আধুনিক নারী’ হিসেবে। ১৮৯০ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন ঢাকা জেলার খিলগাঁও গ্রামে। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ কিছু প্রথমের অধিকারী তিনি, যেগুলো সম্পর্কে জানতে পারলে তার ‘আধুনিকতা’-র বিষয়ে সংশয়ের অবকাশ থাকবে না মোটেই। তবে তার ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার আগে, জানতে হবে তার বাবা শশীভূষণ বসু মল্লিককে।

শশীভূষণের বাড়ি ছিল মূলত নদীয়ার শান্তিপুরে। সরকারি চাকরির সুবাদে তিনি ঊনিশ শতকের শেষার্ধে ঢাকায় চলে আসেন এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। ১৮৮৪ সালে তিনি বিয়ে করেন নগেন্দ্র বালাকে, এবং পরের বছর তারা যোগ দেন ব্রাহ্ম সমাজে।

তবে শশীভূষণ ও তার স্ত্রীর ব্রাহ্ম হওয়ার পেছনে রয়েছে আরেকটি গল্প। একদিন শশীভূষণ শহরের অদূরে জঙ্গলে একটি শিশুকে কুড়িয়ে পেয়ে ঘরে নিয়ে আসেন এবং তাকে পালন করবেন বলে মনস্থির করেন। কিন্তু তাদের এ সিদ্ধান্তকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি হিন্দুসমাজ। ফলে তাদেরকে হিন্দুসমাজ থেকে পতিত হতে হয়, এবং তারা ধর্ম পরিবর্তন করে ব্রাহ্ম হয়ে যান।

এরই সূত্র ধরে শশীভূষণ একক প্রচেষ্টায় ১৮৯২ সালে ঢাকায় অনাথ শিশুদের জন্য ‘উদ্ধারাশ্রম’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে সেটির নাম হয় ‘মাতৃনিকেতন’। এছাড়া শশীভূষণ বেশ কয়েকটি বইও রচনা করেন।

শশীভূষণ যখন ব্রাহ্ম হন, তখন ব্রাহ্ম সমাজ ছিল দ্বিধাবিভক্ত। তিনি ছিলেন কেশবচন্দ্রের ভক্ত, যে কারণে যোগ দেন নববিধানে। ঢাকার নববিধান তখন খুবই হীনবল। ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকে শশীভূষণ উপলব্ধি করেন, এ দেশের যদি উন্নতি করতে হয়, তাহলে দু’টি কাজ করা দরকার। একটি হলো আন্তর্জাতিক বিবাহের মাধ্যমে মানুষের মাঝে আন্তর্জাতিক চেতনা জাগিয়ে তোলা। অন্যটি হলো শিল্পায়ন, যাতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়। তার এই দু’টি উপলব্ধিই পরবর্তী সময়ে তার প্রথম সন্তান হরিপ্রভা বসু মল্লিকের জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

এবার আসা যাক হরিপ্রভার প্রসঙ্গে। যেমনটি আগেই বলেছি, হরিপ্রভার জন্ম ১৮৯০ সালে। তিনি কোথায় পড়াশোনা করেছেন, আর কতদূরই বা পড়াশোনা করেছেন, সেসব প্রসঙ্গে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না। তবে এটুকু নিশ্চিত যে, স্কুলে তিনি পড়েছিলেন। ধারণা করা হয়, হয়তো ইডেন স্কুলেই তিনি পড়েছিলেন, এন্ট্রান্স পর্যন্ত।

এদিকে উয়েমন তাকেদা ছিলেন কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষিত একজন কেমিস্ট। তখনকার দিনে জাপানি সমাজে পৈতৃক সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী হতো বড় ছেলে। তাই অনেক জাপানি ভাগ্যান্বেষণে পাড়ি দিত দূর-দূরান্তের দেশে। ঠিক তেমনই ১৯০৩ সালে ২৪ জন জাপানি নাগরিক ভারতে আসেন কাজের খোঁজে, যাদের মধ্যে একজন উয়েমন। তিনি ঢাকায় একটি সাবানের কারখানা শুরু করেন, নাম ‘ইন্দোজাপানিজ সোপ ফ্যাক্টরি’।

ছোটবেলা থেকেই মায়ের সাথে ‘মাতৃনিকেতন’ দেখাশোনা করতেন হরিপ্রভা। সেখানেই একদিন তার সাথে সাক্ষাৎ হয় উয়েমনের। সেই থেকে তাদের ঘনিষ্ঠতা, এবং এক পর্যায়ে পরিবারের সম্মতিতে ব্রাহ্মসমাজের নিয়মানুসারে উয়েমনকে বিয়ে করেন হরিপ্রভা। বিয়ের পর নামের শেষ থেকে ‘বসু মল্লিক’ উঠিয়ে পরিণত হন হরিপ্রভা তাকেদায়।

আন্দাজ করা যায়, উদারমনা ব্রাহ্ম হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিবাহ ও শিল্পের প্রতি অনুরাগ থাকার ফলেই, শশীভূষণ উয়েমনের সাথে তার মেয়ের বিয়েটি মেনে নেন। তবে বিয়েটি ঠিক কোন বছর হয়, এ নিয়ে মতান্তর রয়েছে। কোথাও দেখা যায়, বিয়ের সাল বলা হচ্ছে ১৯০৪, আবার কোথাও ১৯০৬ বা ১৯০৭।

সে যা-ই হোক, খুব সম্ভবত এটিই ছিল কোনো বাঙালি নারীর প্রথম জাপানি বিয়ে। তাই উয়েমনের সাথে হরিপ্রভার বিয়ে ছিল একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বিয়ের পর উয়েমন তার শ্বশুর শশীভূষণ বসু মল্লিকের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘ঢাকা সোপ ফ্যাক্টরি’। এই প্রতিষ্ঠানের আয়ের কিছু অংশ ব্যায়িত হতে থাকে মাতৃনিকেতনে।

কিন্তু খুব বেশিদিন চলেনি উয়েমনের নতুন কারখানা। কয়েক বছর পরই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে সেটি। এদিকে জাপান ছেড়ে আসার পর দীর্ঘ নয় বছর কেটে গেছে, পরিবারের সাথে কোনোপ্রকার যোগাযোগ নেই উয়েমনের। তাছাড়া জাপানে সদ্যই মেইজি যুগের অবসান ঘটে শুরু হয়েছে তাইশো যুগ। নতুন জাপান তখন পূর্বের দারিদ্র্য কাটিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করেছে। দেশের এই পরিবর্তিত অবস্থাও স্বচক্ষে দেখার বাসনা জাগে উয়েমনের মনে। তাই ১৯১২ সালের শেষ দিকে তিনি সস্ত্রীক জাপানের পথে রওনা দেন।

অবশ্য এর আগেই, হরিপ্রভা জাপান যাত্রা করতে আগ্রহী হয়েছেন শুনে চারিদিকে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কোনো বাঙালি নারীর এটিই হতে চলেছিল প্রথম জাপান যাত্রা। তাই দিনাজপুরের মহারাজা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ২৫ টাকা পাঠিয়ে দেন। এছাড়াও ঢাকাস্থিত জনৈক জাপানি ব্যবসায়ী কোহারা তাকেদা দম্পতিকে ৫০ টাকা উপহার দেন। ঢাকার নববিধান ব্রাহ্মসমাজের পক্ষ থেকে তাদের যাত্রার শুভকামনা করে প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।

১৯১২ সালের ৩ নভেম্বর, হরিপ্রভা ও উয়েমন ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করেন। প্রথমে নারায়ণগঞ্জ থেকে স্টীমারে গোয়ালন্দ। এরপর গোয়ালন্দ থেকে ট্রেনে কলকাতা। আর ৫ নভেম্বর শুরু হয় কলকাতা থেকে জাহাজে করে জাপানের উদ্দেশে যাত্রা। ১০ নভেম্বর তারা পৌঁছান রেঙ্গুনে। সেখানে যাত্রাবিরতিতে একজন পরিচিতের বাসায় থাকেন। ১৩ তারিখ রেঙ্গুন থেকে ফের যাত্রা শুরু। ১৭ তারিখ পৌঁছান পেনাং। ২০ তারিখ সিঙ্গাপুর। ৩১ তারিখ হংকং। ডিসেম্বরের ৯ তারিখ সাংহাই। অবশেষে ১৩ ডিসেম্বর সকালে তারা পৌঁছান জাপানের প্রথম বন্দর ‘পোর্ট মোজি’-তে।

জাপানে পা রাখার পর থেকেই অনেক জাপানি ব্যগ্রভাবে দেখতে শুরু করে হরিপ্রভাকে। সাংবাদিকরাও এসে ছবি তুলতে থাকেন তাদের। এরপর তাকেদা দম্পতি ট্রেনে করে যাত্রা শুরু করেন গ্রামের উদ্দেশে। উয়েমনের বাড়ির বা গ্রামের নাম অবশ্য জানা যায়নি। ধারণা করা হয়, গ্রামটি বর্তমান কোওনান শহরের অন্তর্গত বা তার আশেপাশে কোথাও।

গ্রামের স্টেশনে পৌঁছেই হরিপ্রভা দেখতে পান, তাদেরকে নিতে এসেছেন তার দুই দেবর। কিন্তু শুধু তারাই নন। গোটা স্টেশনই লোকে লোকারণ্য। সকলেই এসেছে ‘ইন্দোজিন’ দেখতে। স্টেশন থেকে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও উপচে পড়া ভিড়। একে তো ঘরের ছেলে বহুদিন বাদে ফিরেছে, তার উপর আবার সঙ্গে ভারতীয় স্ত্রী। ফলে সকলেই যেন ফেটে পড়ছিল কৌতূহলে। যতদিন হরিপ্রভা সেখানে ছিলেন, প্রতিদিনই ছেলেবুড়ো অসংখ্য মানুষ দেখতে আসত তাকে। তবে সবচেয়ে স্বস্তির কথা, হরিপ্রভার শ্বশুর-শাশুড়ি তাকে খুবই আপন করে নেন। তাদের মমতা ও আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে যান হরিপ্রভা।

তাকেদা দম্পতি জাপানে থাকেন চারমাস। ১৯১৩ সালের ১২ এপ্রিল তারা জাপান থেকে ভারতের উদ্দেশে ফিরতি যাত্রা শুরু করেন। হরিপ্রভার শাশুড়ি, ননদ আসেন তাদেরকে কোবে পর্যন্ত পৌঁছে দিতে। এরপর ২৫ দিনের মাথায় তারা ভারতে পা রাখেন।

হরিপ্রভা স্বদেশে ফেরার আড়াই বছর পর প্রকাশিত হয় তার ভ্রমণ বৃত্তান্ত ‘বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা’। ডিমাই ৮ আকারের ৬১ পৃষ্ঠার বইটি ওয়ারীর ভারত মহিলা প্রেসে মুদ্রণ করেন দেবেন্দ্রনাথ দাস। ১১.১১.১৯১৫ তারিখে তা ‘কুমারী শান্তিপ্রভা মল্লিক’ কর্তৃক প্রকাশিত হয় মাতৃনিকেতনের সাহায্যার্থে। এভাবে প্রথম বাঙালি তো বটেই, এমনকি সম্ভবত উপমহাদেশের প্রথম ব্যক্তি হিসেবেও জাপান বিষয়ক বই রচনা করেন হরিপ্রভা। কেননা এটি যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জাপান যাত্রী’ প্রকাশেরও চার বছর আগেই আলোর মুখ দেখে। কেউ কেউ তো এমন দাবিও করে থাকেন, সমগ্র এশিয়া মহাদেশের মধ্যেই হরিপ্রভা প্রথম নারী, যিনি লিখেছেন সূর্যোদয়ের দেশ ঘুরে এসে। আবার গবেষক মনজুরুল হকের মতে,
“চীন বা পূর্ব এশিয়ার বাইরে এশিয়ার অন্য কোনো ভাষায় এর আগে জাপান সংক্রান্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নে সন্দেহমুক্ত হতে হলেও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন।”

হরিপ্রভা তার বইটি শুরু করেছেন এভাবে,”আমার যখন বিবাহ হয়, তখন কেহ মনে করে নাই যে আমি জাপান যাইব। কাহারও ইচ্ছাও ছিল না। কিন্তু আমার বড়ই ইচ্ছা হইত আমি একবার যাই। সে ইচ্ছা স্বপ্নেই পর্য্যবসিত হইত। বিবাহের পর শ্বশুর-শ্বাশুড়ির আশীর্ব্বাদ লাভ করিতে ইচ্ছা হইত। তাঁহাদের নিকট পত্র লিখিয়া যখন তাহাদের ফটোসহ আশীর্ব্বাদ পূর্ণ একখানি পত্র পাইলাম ও তাঁহারা আমাদের দেখিবার জন্য আগ্রহান্বিত হইয়া পত্র লিখিলেন, আমার প্রাণ তখন আনন্দে ভরিয়া গেল। তাঁহাদিগকে ও তাঁদের দেশ দেখিবার আকাঙ্ক্ষা প্রাণে জাগিয়া উঠিল। ঈশ্বরেচ্ছায় আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইতে চলিল…”

হরিপ্রভার সেই বইয়ের গুণগত মানও নিঃসন্দেহে অসামান্য। কেননা তিনি তো জাপানে শুধু শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সাথেই দেখা করেননি, বরং সুযোগ পেয়েছেন জাপানের সমাজব্যবস্থাকে খুব কাছ থেকে দেখার ও অনুভব করার। এ কথাও অনস্বীকার্য যে তার পর্যবেক্ষণশক্তি ছিল প্রখর। তাই তিনি খুবই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জাপানের সামাজিক রীতিনীতি ও আদবকায়দাগুলো খেয়াল করেন, এবং ভারতে দেখে যাওয়া সমাজের রীতি ও প্রথার সাথে তুলনা করতে থাকেন, যা পরবর্তী সময়ে উঠে আসে তার কলমে। রবি ঠাকুরের ‘জাপান যাত্রী’-তে হয়তো জাপানি নান্দনিকতা ও সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটে, কিন্তু হরিপ্রভার বইটিতে এক বাঙালি নারীর ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি এবং জীবনদর্শনও খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধরা দেয়।

হরিপ্রভা তার স্বামীর সাথে জাপানের বিভিন্ন শহর পরিভ্রমণ করে সেগুলোর যেমন বর্ণনা দিয়েছেন, তেমনই আবার মাঝেমধ্যে যোগ করেছেন তৎকালীন জাপানি সংস্কৃতি নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ,

“মেয়েদের পতি, বাড়ির আত্মীয়-স্বজন ও শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা পরম ধর্ম। ইহার কোনোরূপ অন্যথা হইলে স্ত্রী অত্যন্ত লাঞ্ছিত হন। এমনকি শাশুড়ির অপছন্দ হইলে স্বামী অনায়াসে স্ত্রী পরিত্যাগ করিতে পারেন।”

কিন্তু আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, হরিপ্রভার সাথে তার শ্বশুর-শাশুড়ির সম্প্রীতির কথা। ফলে জাপান ছেড়ে আসার সময় হরিপ্রভার কিছুটা মন কেমনও করে উঠেছে তাদের জন্য। তিনি লিখেছেন,

“বিদেশে এমন সরলস্বভাব, স্নেহপরায়ণ শ্বশুর, শাশুড়ি ঠাকুরানীর মার মতো যত্ন-ভালোবাসা পাইয়া ইহার সহিত বসবাস করিতে ইচ্ছা হয়, কিন্তু সে সম্ভাবনা কোথায়?”

প্রকাশের পর ‘বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা’ বইটি অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় এ বই সম্পর্কে লেখেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। অন্নদাশঙ্কর রায়, বুদ্ধদেব বসুদের মতো খ্যাতিমান সাহিত্যিকও কৈশোরে এই বই পড়ে মুগ্ধ হন। এরকম হয়তো তৎকালীন আরো অনেক পত্রপত্রিকাতেই এই বই সম্পর্কে ইতিবাচক কথা ছাপা হয়েছিল। যে জাপান সম্পর্কে তখনকার দিনে বাঙালির তেমন কোনো ধারণাই ছিল না, সেখানে পূর্ববঙ্গের এক নারী পৌঁছে গেলে এবং নিজের চোখ দিয়ে দেখা এক নতুন সমাজ-সংস্কৃতিকে সাবলীল ভাষায় বইয়ের পাতায় উঠিয়ে আনলে, সে বইয়ের একটি আলাদা কদর তো থাকবেই!

সাহিত্যিক হিসেবে কেবল এই একটি বই লিখেই থেমে যাননি হরিপ্রভা। এছাড়াও তিনি লেখেন ‘সাধ্বী জ্ঞানদেবী’ এবং ‘আশানন্দ ব্রহ্মনন্দ কেশবচন্দ্র সেন’ নামে আরো দু’টি বই। ‘জাপানে সন্তান পালন ও নারীশিক্ষা’ শিরোনামে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় তার একটি নিবন্ধও ছাপা হয়। তবে একথাও সত্য যে, প্রথম বইটি লিখে তিনি যতটা আলোড়ন তুলেছিলেন, সে তুলনায় পরের বই বা নিবন্ধের মাধ্যমে তিনি খুব বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেননি। তাই তো এক পর্যায়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান হরিপ্রভা।

কিন্তু হরিপ্রভার জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। সেসব অভিজ্ঞতার আখ্যান তিনি লিখেছেন ‘যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপানে’ নামক অন্য এক আত্মকথায়।

মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে জাপান সরকার ভারতে অবস্থানকারী সমস্ত জাপানি নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাই ১৯৪১ সালে স্বামীর সাথে পাকাপাকিভাবে জাপানে থাকার উদ্দেশ্যে বোম্বে থেকে জাহাজে উঠতে হয় হরিপ্রভাকে। কিন্তু আগেরবার জাপানে গিয়ে যে আত্মীয়স্বজনদের সান্নিধ্য তিনি পেয়েছিলেন, এবার তার কোনোকিছুই ছিল না। একসময়কার শান্ত-সুশৃঙ্খল জাপান যুদ্ধের তাণ্ডবে পুরোপুরি বিপর্যস্ত। এদিকে জাপানে চলছে চরম অর্থনৈতিক সঙ্কটও। ফলে হরিপ্রভাদের বাসস্থান বা উপার্জন কিছুই ছিল না। এরই মধ্যে গোদের উপর বিষফোঁড়া হিসেবে উপস্থিত হয় উয়েমনের শারীরিক অসুস্থতা। সব মিলিয়ে সমস্যা ক্রমশ প্রকটতর হতে থাকে হরিপ্রভার জন্য।

কিন্তু ঠিক এ সময়ই হরিপ্রভা পাশে পান বিপ্লবী রাসবিহারী বসুকে। তার মাধ্যমে হরিপ্রভার পরিচয় হয় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সাথেও। এই দুই কীর্তিমান ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীর কল্যাণে হরিপ্রভা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হন। তার মনে জাগে দেশকে স্বাধীন করার ইচ্ছা। সেই সাথে তার একটি চাকরিও জুটে যায়। সেটি হলো টোকিও রেডিওতে আজাদ হিন্দ ফৌজের হয়ে বাংলায় সংবাদ পাঠিকার চাকরি।

সে সময় টোকিও শহরে মিত্রবাহিনীর বোমাবর্ষণ অব্যাহত ছিল। কিন্তু সেসবের তোয়াক্কা না করে হরিপ্রভা গভীর রাতে মাথায় হেলমেট দিয়ে চলে যেতেন টোকিও রেডিও স্টেশনে। শুরুর দিকে পরনে শাড়িই থাকত। কিন্তু ঠিকমতো যে বাড়িতে ফিরতে পারবেন, তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই পেটিকোটে একটি পকেট বানিয়ে সেটির ভেতর পাসপোর্ট, টাকাপয়সা, গয়নাগাটি বহন করতেন তিনি। পরের দিকে অবশ্য শাড়ি পরে চলাচলে অসুবিধা হওয়ায়, তিনি স্বামীর প্যান্ট পরেই চলাফেরায় অভ্যস্ত হয়ে যান। এভাবে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের হয়ে বাংলায় সংবাদ পাঠ করেন।

যুদ্ধ শেষ হলে, ১৯৪৭ সালে অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে দেশে ফেরেন হরিপ্রভা। কিন্তু তার জন্মস্থান পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায়, তিনি পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে বোন অশ্রুবালা মল্লিকের বাড়িতে ওঠেন। পরের বছরই তার স্বামী পরলোকগত হন ওই জলপাইগুড়িতেই। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পরও ভেঙে পড়েননি হরিপ্রভা। থেকেছেন বরাবরের মতোই দৃঢ়চেতা। স্বামীর প্রতি ভালোবাসায় কোনো কমতি ছিল না তার। তাইতো জাপানি বিয়ে করার দরুন কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলেও, হিন্দু বা ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বী বিধবা নারীদের মতো তিনি সাদা শেমিজ ও সাদা থান পরতে আরম্ভ করেন।

১৯৬৭ সালে, জীবনের সায়াহ্নে এসে হরিপ্রভাকে সম্মুখীন হতে হয় এক নতুন বিপর্যয়ের। গীতা নামের বাড়ির পরিচারিকা, আদতে যে ছিল একটি গ্যাংয়ের সদস্য, মেরে তার মাথা ফাটিয়ে দিয়ে যাবতীয় মূল্যবান সম্পদ চুরি করে পালিয়ে যায়। ফলে আশি ছুঁই ছুঁই বয়সের হরিপ্রভাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৭২ সালে কলকাতার শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

২০১২ সালে হরিপ্রভার প্রথম জাপান যাত্রার শতবর্ষে বাংলাদেশের প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল জাপান ফাউন্ডেশনের সহায়তায় হরিপ্রভার জীবনের উপর একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। সেটির শিরোনাম ‘জাপানী বধু’। ইংরেজিতে ‘দ্য জাপানিজ ওয়াইফ’। সেই তথ্যচিত্রের শেষাংশে বলা হয়,”হরিপ্রভাকে আমরা খুঁজে পাইনি। খুঁজে পাইনি জাপানে হরিপ্রভাদের গ্রামটিও। তবে যেসব নারীরা আজো ভালোবাসা ও স্বামী-সংসারের টানে ভিনদেশের এক প্রবাসী জীবন বেছে নিতে দ্বিধা করেন না, সেসব সাহসী নারীদের মাঝেই যেন খুঁজে পাই হরিপ্রভার প্রতিচ্ছায়া। না-ই বা তোমায় খুঁজে পেলাম, হরিপ্রভা!”

কিন্তু হরিপ্রভা তার জীবনভর যেসব কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন, বিশেষত পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সেও যেভাবে দূর দেশে বসে দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে নিজের জীবন বাজি রেখেছেন, সে তুলনায় শুধু তার ‘ভিনদেশী জীবন বেছে নেয়া’-র দিকটির উল্লেখ বোধহয় কমই হয়ে যায়।

হরিপ্রভা সম্পর্কে ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের মূল্যায়ন অপেক্ষাকৃত বেশি যথাযথ। তিনি লিখেছেন,”হরিপ্রভার বইয়ের একটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে, তা ঠিক। কিন্তু আমার কাছে যেটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, তা হলো জীবন সম্পর্কে মফস্বল শহরের এক মহিলার দৃষ্টিভঙ্গি, যা এ শতকের যেকোনো আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তুলনীয়। সেই অর্থে হরিপ্রভা তাকেদাকে ঢাকা শহরের প্রথ








Leave a reply