যাত্রা কভু যাবে না থমকি: কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য

|

একটি ভাটিয়ালি গানের সুর থেকে যার জন্ম- সেই ভাটি অঞ্চলের ছেলে কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য; পরবর্তীকালে যিনি হয়ে উঠলেন দুই বাংলার হাজার হাজার লোকগানের সংগ্রাহক এবং গবেষক। তাঁর বিভিন্ন আলাপচারিতায় বাড়ির পেছনে বয়ে চলা আবাল্যের সহচর বরাকনদীর স্মৃতি হানা দিয়েছে বার বার। সেই বরাকনদীর শহর শিলচর থেকে কালিকাপ্রসাদের পারিবারিক স্মৃতি নিয়ে কলম ধরেছেন তাঁর ছোট বোন মঞ্জরি ভট্টাচার্য। এই পারিবারিক স্মৃতিকথনে যেমন উঠে এসেছে কালিকাপ্রসাদের ছেলেবেলার নানা অজানা তথ্য, তেমনি উঠে এসেছে অশেষ শূন্যতাবোধ থেকে এক বোনের হৃদয়ের শোকস্তবদ্ধতা। কিন্তু এই মৃত্যুশোকের আবর্তনে লেখাটির পরিসমাপ্তি নয়, বরং ভয়ংকর আঘাতে অন্ধকারে তলিয়ে গিয়ে আবার নতুন আলোর খোঁজে পথ চলার দুর্নিবার চেষ্টাই হয়ে উঠেছে লেখাটির বিষয়।

এক বিশাল কর্মকাণ্ডের অধ্যায় পেরিয়ে ইতিহাসের গোধূলিবেলায় এই পরিবারে আমার জন্ম– তাই আমার ছেলেবেলার স্মৃতিজুড়ে আছে শুধু এক পড়ন্ত বিকেলের ছবি। সূর্য ডোবার আগে গোধূলির আলোয় সেই ফেলে আসা ইতিহাস অনেকটাই আমার কাছে আবছায়ার মতো। ঝার-লন্ঠনের জৌলুস আর ঝাঁ-চকচকে উজ্জ্বল আলোয় সেই ইতিহাসকে আমি দেখিনি; দেখেছি অন্ধকার গাঢ় হয়ে ওঠার প্রাকমুহুর্তে প্রদীপের অবশিষ্ট আলোয়। সেই দেখার অনেকটা জায়গা জুড়েই হয়তো অসম্পূর্ণতা রয়েছে।

একজন প্রবীণ ভাষ্যকারের অভিজ্ঞতা, অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে ফাঁক-ফোকর চোখে পড়বে হয়তো অনেকটাই, তবু পারিবারিক সূত্রে যে গল্প-কথাগুলো মুখে মুখে শুনে বড় হয়েছি, এই লেখাটি হয়ে ওঠার পেছনে তাদের অবদান আজ অনেকখানি।

এই পরিবারে এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যময় শেকড়ের রসে মন-প্রাণ পুষ্ট হয়ে আমাদের বড় হয়ে ওঠা। বরাবর আমরা এটা জেনেই বড় হয়েছি, ঈশ্বরকে ডাকার একমাত্র মন্ত্র হলো সঙ্গীত। তাই বাড়িতে ধর্মীয় উপাসনার সঙ্গে সঙ্গীতের অস্তিত্ব যেমন ছিল অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়ানো, তেমনই আবার অনেক মৃত্যু-আঘাত, দুঃখ-যন্ত্রণা পেরোতে গিয়ে সুরহীন মুহুর্তগুলোও সুরসৃষ্টি করেছে বার বার। এক রক্ষনশীল গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মেও আমরা সবসময় দেখে এসেছি সুরসাধনায় মানুষের সাথে মানুষের মেলবন্ধনে সামাজিক শ্রেণী বিভাজন, নানা সংস্কার কখনও কোনো ব্যবধান তৈরি করতে পারেনি।

আমাদের পিতামহ দাদুমনির ছত্রছায়ায় যে সঙ্গীত-পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছিল বাড়িতে, সেখানে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ – সাহেব, আয়াত আলী খাঁ, চিন্ময় লাহিরি, পণ্ডিত ভিজি যোগ, পারভিন সুলতানা, বাহাদুর খাঁ, উদয়শংকর, ভূপেন হাজারিকা, প্রতিমা বরুয়া, সঙ্গীতাচার্য ননীগোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়, শান্তিদেব ঘোষ, রামকুমার চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সঙ্গীতের সমঝদার বিভিন্ন জ্ঞানী-গুণী শিল্পীদের সমাগম যেমন হতো; তেমনই আউল, বাউল, ফকীর, দরবেশ প্রমুখ সাধকের প্রতিনিয়ত আনাগোনায়, দোতারার সুরে আর ডবকীর ছন্দে, শাস্ত্রীয় রাগরাগিনী আর লোকসুরের সমন্বয়ে এক অদ্ভুত মায়া সুরলোক যেন তৈরি হয়ে উঠেছিল বাড়ির গোটা পরিমণ্ডল জুড়ে– দাদাভাই, মানে কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের জন্ম এই পরিবারের সেই সঙ্গীত-পরিমণ্ডলেই।

দাদাভাইয়ের সঙ্গে আমার বয়সের তফাৎ প্রায় পনেরো বছরের, তাই তাঁর কাছে বাবা, কাকু, জ্যাঠু এঁদের স্নেহসুলভ স্পর্শই পেয়েছি বরাবর। তাঁর ছোটবেলার স্মৃতিও সবই আমার বাবা, পিসিদের মুখে শোনা। দাদাভাইয়ের পড়াশোনা, গানবাজনা, দোহারের প্রাণপ্রতিষ্ঠা, সবকিছুর পেছনে যাঁর অবদান ছিল অক্লান্ত, তিনি আমাদের সকলের ছোটোপিসি আনন্দময়ী ভট্টাচার্য। সেই ছোটোপিসির কাছেই শুনেছি, সমস্ত বাংলাদেশ জুড়ে যখন উত্তাল পরিস্থিতি, মুক্তিযুদ্ধের আবর্তে একাত্ম হয়ে সংগ্রাম করছে দেশের মানুষ, বাঙালি খুঁজে বেড়াচ্ছে তার আত্মপরিচয়– সেই বিশেষ সময়ে দাদাভাইয়ের জন্ম।

দুধের শিশু খাওয়া ভুলে অবাক বিস্ময়ে শুনতো বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা, স্লোগানে স্লোগানে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠতো তার চোখ-মুখ। সমস্ত শিরায় শিরায় তখন তার ছুটে বেড়াত এক অদ্ভুত চাঞ্চল্য, সেই ছেলেই বড় হয়ে নিজেকে বলতে শুরু করলো, “আমি মুক্তিযুদ্ধের সন্তান”।

আমাদের ছোটকাকু অনন্তকুমার ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে একটি লোকগানের দল গড়ে উঠেছিল বাড়িতে, যার নাম ছিল ‘লোকবিচিত্রা’। এই লোকবিচিত্রার দল সংগঠিত হবার পর যে গানগুলো আমাদের রোজকার জীবনে ঘুরতো পীর-ফকীর, রিক্সাওয়ালা, ফেরীওয়ালা শ্রমিক, চাষা-ভূষোদের মুখে মুখে, সেগুলোই এবার উঠে এলো শিক্ষিত-বৌদ্ধিক মহলে গানের আসরে; বহু অজানা হারিয়ে যাওয়া গান পেল মঞ্চের মর্যাদা, বহু গ্রাম্য লোকশিল্পী পেলেন তাদের যোগ্য সম্মান।

এই লোকবিচিত্রার গানের চর্চা হতো আমাদের বাড়িতে, ছোট্ট কালিকাপ্রসাদ তখন থেকেই লোকবিচিত্রার সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। গানের আসর থেকে কিছুতেই তাকে সরানো যেত না। গান শুনতে শুনতে কখনও ছোটোপিসি, কখনও ছোটোকাকুর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়তো সে।

এই প্রসঙ্গে লোকবিচিত্রার এক সদস্যের কথা এখানে উল্লেখ করা আবশ্যক, নাম তার তুরফান আলী। গল্প শুনেছি, এই তুরফান আলীর সহায়তায় আমাদের ছোটোকাকু বিভিন্ন গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে বিচিত্র সব লোকগান এবং শিল্পীদের সংগ্রহ করে আনতেন। ক্রমে তুরফান আলী হয়ে উঠল দাদাভাইয়ের অন্তরঙ্গ বন্ধু। তুরফানের কাছ থেকে নানারকম গল্প শোনা, তার কোলে বসে খাওয়া, তার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমানো- সারাদিন যেন আঠার মতো সেঁটে থাকত দাদাভাই এই মানুষটার সঙ্গে। এই গল্পগুলো যতবার শুনেছি ততবারই মনে হয়েছে, আমাদের ছোটোকাকু অনন্তকুমার ভট্টাচার্য যে বিশাল লোকগানের সংগ্রাহক হয়ে উঠেছিলেন, ছোট্ট শিশু ‘প্রসাদ’ আসলে সকলের অলক্ষ্যে তখন একটু একটু করে পাড়ি দিচ্ছিল সঙ্গীতের সেই বিশাল সমুদ্রের দিকে– কেউ বুঝতেই পারেনি ছোটোকাকুর উত্তরাধিকারী তৈরি হচ্ছিল আসলে তারই অজান্তে।

বাড়ির সকলের আদরের কালিকাপ্রসাদ ওরফে ‘প্রসাদ’। তার মতো এমন বৈচিত্র্যময় শিশু আমাদের পরিবারে ছিল বিরল। গান-বাজনা, পড়াশোনা সবকিছুতে তার সমান আগ্রহ এবং সব বিষয়ে সে সমান পারদর্শী। গল্প শুনেছি একবার শিশুতীর্থ স্কুলের শিশুদের দ্বারা মঞ্চস্থ হলো ‘বাল্মীকি প্রতিভা’, সেখানে বাল্মীকির ভূমিকায় দাদাভাইয়ের গাম্ভীর্যপূর্ণ অভিনয়দক্ষতা দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়েছিলেন সমস্ত দর্শক-শ্রোতা।

বনেদী একান্নবর্তী পরিবারে মা, বাবা, জ্যাঠা, কাকা, পিসি, সবার স্নেহ ও প্রশ্রয়ে, বিশেষ করে ছোটোপিসির তত্ত্বাবধানে ক্রমে তার জীবনের গণ্ডী ছড়াতে লাগলো কাছে থেকে দূরে, দূরে থেকে বহু দূরে।

পিসি একদিন একটা দারুণ গল্প বলেছিলেন আমাদের। একবার দাদাভাইয়ের এক মাস্টারমশাই পিসিকে এসে অভিযোগ করেন দাদাভাই নাকি ইদানীং পড়াশোনায় খুব অমনোযোগী হয়ে পড়েছে। এর কিছুদিন পর পিসি একদিন আবিষ্কার করলেন, পড়ার টেবিলে থরে থরে সাজানো কার্ল মার্ক্সের বই। তিনি পেছন থেকে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলেন, ওটুকু ছেলে চুলের মুঠি শক্ত করে চেপে আওরে চলেছে মার্ক্সীয় তত্ত্ব। এই দৃশ্য দেখে পিসির বিস্ময়ের সীমা রইল না।

ততক্ষণে পিসিকে ঘরে দাঁড়িয়ে দেখে দাদাভাইয়ের শুরু হয়ে গেছে থরহরি কম্প, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। টানা পনেরোদিন চললো বাক্যালাপ বন্ধ দশা। একদিন হঠাৎ পেছন থেকে এসে জাপটে ধরে ছেলের সে কী কান্না! “তুমি প্লিজ কথা বলো ছোটো, আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, এমনটা আমি আর কখনো করবো না…”, পিসি তখন তাকে বোঝালেন, কার্ল মার্ক্স পড়া অপরাধ নয়, কিন্তু কোনো কিছু লুকিয়ে পড়া অপরাধ। কার্ল মার্ক্স নিশ্চয়ই পড়া উচিত, তবে সঠিক সময় এলে, স্কুলের পড়াশোনায় অবহেলা করে কার্ল মার্ক্স পড়ার বয়স এখনো হয়নি।

সেদিন দাদাভাই নাকি মাথা নিচু করে প্রতিটি শব্দ মেনে নিয়েছিল অক্ষরে অক্ষরে, কোনো প্রতিবাদ সে করেনি। কিন্তু পিসি সেদিন মনে মনে এ-ও বুঝতে পেরেছিলেন- এই ছেলে কোনো শাসনের বাঁধনে জব্দ হবার নয়। তার অন্তর্মুখী মনে বহির্বিশ্বের যে ছায়া পড়েছে, তাতে সমস্ত নিয়মের বাঁধন ছাড়িয়ে একদিন সে প্রবেশ করবে অন্য এক বৃহৎ বিশ্বে। বাস্তবে হলোও তা-ই। রাজনীতি, পার্টি, এস.এফ.আই, গণনাট্য, যাদবপুর ইউনিভার্সিটি, দোহার– একেক ধাপে তৈরি হতে লাগলো একেক অধ্যায়।

বর্তমানে যখন অকাল বর্ষা নেমেছে চারদিক জুড়ে, আমার মনে পড়ে বেশ কয়েক বছর আগে আমাদের বাড়িতে পদ্মপুরাণ গানের আসর বসেছিল আশ্বিন মাসে, দুর্গাপুজোর ঠিক পরেই। উদ্যোগটা ছিল সম্পূর্ণ দাদাভাইয়ের। এই ধরনের গানের আসর আমি আগে কখনও দেখিনি– সে এক নতুন অভিজ্ঞতা।

বাড়ির উঠোনে চাঁদোয়া টাঙিয়ে বিপুল সমারোহে বসে পদ্মপুরাণ গানের আসর। গানের দল এসেছিলেন করিমগঞ্জ থেকে। শ্রুতি পরম্পরায় ঐতিহ্যবাহিত অবলুপ্ত প্রায় এমনসব লোকগান শোনার সু্যোগ ঘটেছিল শুধুমাত্র দাদাভাইয়ের কল্যাণে। আর গান তো শুধু শোনা নয়, দাদাভাইয়ের উপস্থিতি মানে ছোট ছোট করে বিভিন্ন গানের ব্যাখ্যা বুঝিয়ে মনে গেঁথে দেওয়া। এই শিল্পীদের দীর্ঘ সাধনা, অধ্যবসায়, বিভিন্ন যন্ত্রে তাদের দক্ষতা, পদ্মপুরাণ গানে ব্যবহৃত ‘পাখাজ’ যন্ত্রটির বিবরণ, ইতিহাস; পাখাজ এবং পাখোয়াজের মধ্যে তারতম্য, কেন এগুলোর একটি আর্কাইভ করে রাখা প্রয়োজন আজকের সময়ে; এই অখ্যাত লোকশিল্পীদের নিয়ে ওয়ার্কশপের আয়োজন করে কীভাবে একটা ডকুমেন্টশন সম্ভব হতে পারে- যেখান থেকে উত্তর-প্রজন্ম জানবে, শিখবে লোকঐতিহ্যকে, লোকগান ও লোকনৃত্যকে– এসব আলোচনা শুনতে শুনতে বার বার একটা কথাই মনে হয়েছিল সেদিন- একজন মানুষ কতোটা সাধনায় বিভোর, আত্মনিমগ্ন এবং নিজের সংস্কৃতির শেকড়সন্ধানী হলে তবেই এমনভাবে তার সময় থেকে এগিয়ে নতুন নতুন চিন্তা-ভাবনার সব দরজা উন্মুক্ত করে দিতে পারে আমাদের সামনে!

দাদাভাই শিলচরে এলে তাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলার দায় পড়তো আমার ঘাড়ে। ঘড়িতে এলার্ম দিলে চলবে না, সকাল-সন্ধ্যায় ডেকে ঘুম ভাঙাতে হবে যতবার ডাকতে গিয়েছি, দাদাভাইয়ের ক্লান্ত ঘুমে কাতর মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া হয়েছে বড্ড রকমের; ঘুম ভাঙাতে মন সায় দেয়নি, সরে এসেছি তাই দু-একবার ডেকেই। কিন্তু মনের মধ্যে এখন প্রতিদিন নিরন্তর ডেকে চলেছি, “দাদাভাই শুনতে পাচ্ছো? ওঠো দাদাভাই, ওঠো… ওঠো…।”

দাদাভাই অনেক রাত পর্যন্ত জেগে লেখাপড়া করতো। মাঝে মধ্যে রাতে বিছানা থেকে উঠে দেখতাম দাদাভাইয়ের ঘরে আলো জ্বলছে, স্বস্তি ফিরে পেতাম সেই আলো দেখে। বাড়ির সকলকে নিশ্চিন্ত নিদ্রায় ঘুম পাড়িয়ে দাদাভাই যেন অতন্দ্র প্রহরী হয়ে জেগে বসে আছে। ও চলে যাওয়ার পর প্রথমদিকে ছোটোপিসির নির্দেশ এলো, রাতে ওর ঘরে আলো নেভানো যাবে না– সমস্ত রাত ধরে জ্বলতে লাগলো আলো। কিন্তু রাতে যতবার উঠে দেখেছি সেই আলো, বুকের মধ্যে কেবল বেজে উঠেছে নেই, নেই, নেই– আর কোথাও নেই, আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না দাদাভাইকে। আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় মনে হয়েছে,

আঁধার নিশার বক্ষে যেমন তারা জাগে,
পাষাণগুহার কক্ষে, নিঝর ধারা জাগে,

এমনি করে আমাদের অন্ধকার পাষাণপুরীতে জ্বলতে লাগলো একটিমাত্র আলো।আমাদের বাড়ির একশ বছরের পুরোনো দুর্গাপুজোর এক প্রধান আকর্ষণ ছিল গান, আর সেসব গানের আসরের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল দাদাভাই। দেবীর বোধন থেকে শুরু করে বিসর্জন পর্যন্ত প্রত্যেক প্রহরে প্রহরে দেবী আরাধনা হতো গান দিয়ে। দাদাভাই চলে যাওয়ার পর নবমীনিশির গানগুলো যতবার শুনেছি, প্রতিবারই মনে হয়েছে– এই যে নবমীনিশির বিশাল আয়োজন, মা মেনকার কাতর অনুনয় প্রার্থনাকে ব্যর্থ করে উমাকে মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার নিয়তির দুর্দৈব নিষ্ঠুর প্রয়াস, এর সঙ্গে কি কোথাও আমাদের দুঃখ-যন্ত্রণার কথাগুলোও এক সুরে-তালে বাঁধা নয়! সোহিনী রাগের বিষাদে জড়িয়ে আছে এ-কোন মায়ার বাঁধন– যাকে কাটানো যায় না কিছুতেই! ললিতের আলাপে ভোরের আলো যত ফুটে উঠছে আকাশে, ফুরিয়ে চলেছে তত অনন্ত সময়। যাকে প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরে রাখার কথা ছিল, সবশেষে তাকে ভাসানে বিদায় জানাতে হলো– ‘বিসর্জন’ এই অর্থে বলবো কার!

আমি আজও কিছুতেই ভেবে পাই না, আমাদের কোন পূর্বসূরী চাঁদ সওদাগরের পুজোয় অবহেলা হয়েছিল নিষ্ঠুরা প্রকৃতি ভাগ্যদেবীর, যার অভিশাপের প্রতিস্রোত বয়ে চলেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে! কোন অসতর্ক মুহুর্তে কালনাগিনী প্রবেশ করেছিল ছিদ্রবলে! ভেবে পাই না ইনোভা গাড়িতে বসে মাত্র একচল্লিশ মিনিটের ব্যবধানে কোন কালঘুমে ঢলে পড়েছিল দাদাভাই!

আসলে চাঁদ সওদাগরের অনমনীয় ব্যক্তিত্ব, দৃঢ়তা, আত্মপ্রত্যয় রয়েছে আমাদের পূর্বসূরীদের প্রত্যেকের রক্তে। প্রশ্নটা দ্বন্দ্ব নিয়ে নয়, আত্মবিশ্বাস নিয়ে, জীবনবোধের প্রতি স্থিতিশীল আস্থা নিয়ে। যা মন-প্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করি তাকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকার দৃঢ়তা এবং সেই সঙ্গে মাটির বহু গভীর থেকে জীবনবোধের নানা রসদ সংগ্রহ করা– স্বপ্নের মতো যা ছিল এতদিন অধরা, অথচ যা শেকড়ের মতো আজও অবিচ্ছিন্ন। সেই অর্থে দাদাভাই যেন প্রকৃত উত্তরাধিকারী হয়ে বহন করে চলেছিল সেই জয়ধ্বজা। কিন্তু শ্রান্তিহীন সেই ছুটে চলা থেমে গেল হঠাৎ- আর আমরা রয়ে গেলাম এক অভিশপ্ত মুহুর্তের সাক্ষী হয়ে।

দাদাভাই লিখেছিল, “শাহবাগ মানে ফাগুনে-পলাশে-বসন্তে প্রতিরোধ/ শাহবাগ মানে বাহান্ন আর একাত্তরের শোধ।”– যতবার প্রেমের সঙ্গে অপ্রেমের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে, যতবার মুক্তধারাকে ছাপিয়ে অচলায়তনিক রুদ্ধতা প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠতে চেয়েছে– ততবার ‘জয়সিংহের’ আত্মবিসর্জন অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

দাদাভাইয়ের মৃত্যু আমার কাছে অনেকটা সেই রকমের মৃত্যুর, যে মৃত্যু সময়ের সাথে সাথে সময় থেকে ছিন্ন হয়ে নয়, সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মুক্তির চরিতার্থতা অর্জন করে। মনে আছে, শিলচরে ‘দোহার’-এর শেষ অনুষ্ঠানে এই গানটি যখন শুনেছিলাম, মঞ্চে দাদাভাইয়ের দু’চোখ বেয়ে অঝোরে পড়ছিল জলের ধারা, লিখতে লিখতে আবারও সেই গানটি মনে পড়লো,ফজরের নামাজের কালে, ছিলাম আমি ঘুমের ঘোরে,
জহর গেলো আইতে যাইতে, আসর গেলো কানের দায়ে, নামাজ আমার হইল না আদায়! আল্লাহ, নামাজ আমি পড়তে পারলাম না…








Leave a reply